কিংবদন্তি এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী


মুনসুর রহমান
ভাষা, ভঙ্গি আর স্বভাবসুলভ উচ্চারণের মাধ্যমে মানুষের সুখ–দুঃখকে নিজের অনুভূতির সাথে এক সূতোয় বেঁধে যিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন, তিনি হলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মাটি আর মানুষের কাছে থেকে রাজনীতি করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং আস্থার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শুধু চট্টগ্রাম শহরে নয়; শহরের বাইরেও গ্রাম-গঞ্জে মাঠে-ঘাটে যার নাম এখনো সবার মুখে মুখে। তিনি নগর পিতা তথা কিংবদন্তি হয়ে জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও মাতিয়ে গেছেন দেশ এবং মাতৃকার মানুষকে। আর চট্টগ্রামের মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ‘চট্টলবীর’ উপাধিও দিয়েছিলেন।
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধিকার আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক হিসাবে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি ডিএলএফ কমান্ডার ছিলেন। উত্তর প্রদেশের তান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্কোয়াডের কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি। সম্মুখ সমরের যোদ্ধা মহিউদ্দিন স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। জীবনকে তুচ্ছ করে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন সম্মুখ সমরে। যুদ্ধ করেন ভারত-বাংলা যৌথবাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের অধীনে। একাত্তরে গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে আইএসআই (পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা) এর হাতে আটক হয়ে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেন। পরে পাগলের আচরণ করে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যান ভারতে।
স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। যুবলীগের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ পান। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দীন। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পড়াা থেকে বেচে যান, মৃত্যু বরণ করেন সাথি মৌলভি সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে প্রতি বিপ্লবীদের সাথে যোগ দেন। লক্ষ্য সামরিক জান্তা, খুনি মোশতাককে সামরিক ভাবেই পরাস্ত করা। কিছুদিন পরেই দলের নির্দেশে পন্হা পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনিতিতে। তৎকালিন সময়ে প্রবল ক্ষমতাশালি হয়েও ক্ষমতার মোহ একচুলও স্পর্শ করেনি তাকে।
নব্বইয়ের গণআন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা রেখে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির অন্যতম কিংবদন্তি বলে বিবাচিত হন সর্ব মহলে। রাজাকার আর সাম্প্রদায়ীক শক্তিকে ক্রমাগত পরাস্হ করে, একানব্বইয়ের ঘুর্নিঝড়ে দুস্হ জনতার পাশে দারিয়ে, অসহযোগ আন্দোলনে খালেদার সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, গরিব-দুঃখি-শ্রমিকের অধিকারের কথা বলে মহিরুহে পরিনত হন আজকের মহিউদ্দীন।
এতকিছুর পরও থেমে থাকেননি এই উদ্যমী জননেতা। গণমানুষের তথা চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রমাগত ছুটে চলেছেন। উপেক্ষা করেছেন রক্তচক্ষু। চালিয়ে গেছেন উন্নয়নের চাকা। উড়িয়ে চলেছেন অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতি আর মুল্যবোধের পতাকা।
এ্ই কিংবদন্তি ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জম্ম গ্রহণ করেন।পিতার নাম মরহুম হোসেন আহমদ চৌধুরি আর মাতা মরহুম বেদৌরা বেগম। আট ভাইবোনের মাঝে মহিউদ্দিন মেঝ। তার পিতা চাকুরী করতেন আসাম বেংগল রেলওয়েতে।
পিতার চাকরির সুবাদে মহিউদ্দিন পড়াশুনা করেছেন মাইজদি জেলা স্কুল, কাজেম আলি ইংলিশ হাই, আর প্রবর্তক সংঘে। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। মাধ্যমিকের শেষে বাবার আদেশে ভর্তি হয়ে ছিলেন ডিপ্লোমা ইন্জিনিয়ারিং এর কোর্সে। সেখানের পাঠ না চুকিয়ে ভর্তী হন চট্টগ্রামের অন্যতম বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজে। বছর না ঘুরতেই কমার্স কলেজ, আর শেষ মেষ সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৭ সালে ডিগ্রি পাস করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এবং পরে আইন কলেজে ভর্তি হলেও শেষ করেননি। কিন্তু সিটি কলেজেই তার বিপ্লবী রাজনৈতীক জীবনের হাতেখরি।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরও যুদ্ধ করেছেন তিনি। “একাত্তরের এই মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যু পর্যন্ত ছিলেন শুধু চট্টগ্রাম নগর নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নয়, পুরো চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের তিনি অভিভাবক ছিলেন।” তিনি চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বড়লোকদের জন্য রাজনীতি করেন নি। নিপীড়িতদের জন্যই তিনি রাজনীতি করেছেন।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগের সিঁড়ি বেয়ে প্রায় দুই যুগ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকার পর ২০০৬ সালের ২৭ জুন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ১৯৯৪, ২০০০, ২০০৫ সালে তিন দফায় এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মানুষের ভালবাসায় স্নিগ্ধ হয়েছেন বার বার তিনি। গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে, শত কষ্ট, বেদনা, নির্যাতন সহ্য করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতায় ভুগে লাখো লাখো মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন বড্ড অসময়ে তিনি। প্রিয় নেতার মৃত্যু যেন কেউ মানতেই পারছেন না। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেক নেতাকর্মীও চট্টগ্রামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার আপোষহীন ভূমিকার কারণে তাকে অনেক পছন্দ করতেন। তবে তিনি পরপারে চলে গিয়েও রেখে গেছেন এক নয়, অনেক অনুকরণীয় উদাহরণ।
লেখক : মুনসুর রহমান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সাপ্তাহিক সূর্যের আলো।

x

Check Also

চট্টগ্রামে বিভাগীয় পর্যায়ে ৮ জানুয়ারী হতে বাংলাদেশ যুব গেমস’২০১৮ শুরু হচ্ছে

ক্রীড়া প্রতিবেদকঃ৬জানুয়ারী বাংলাদেশ যুব গেমস’২০১৮ উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া উদ্যোগে ৬ জানুয়ারী শনিবার বিকাল ৩টায় ...