ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারছে না পানিবন্দীরা

লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার ৩৫টি ইউনিয়নে প্রায় ৯৫ হাজার পরিবারের অন্তত ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসব মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষুধার কষ্ট তারা আর সহ্য করতে পারছে না।

এছাড়া মঙ্গলবার সকালে সদরের মোগলহাট এলাকায় ধরলার পানিতে ডুবে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা হলেন- জারি ধরলা গ্রামের ওমর মিয়ার ছেলে ওয়াজেদ মিয়া (৪৬) এবং মোগলহাটের ইটাপোতা গ্রামের জহির আলীর ছেলে আয়নাল আলী (১৩)। এই নিয়ে এ জেলায় গত ৩ দিনে বন্যার পানিতে ডুবে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের ৩য় বৃহত্তর বুড়িমারী স্থলবন্দরের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পানিবন্দী মানুষগুলোর মাঝে দেখা দিয়ে ভয়াবহ ত্রাণ সংকট। অনাহারে অর্ধাহারে রয়েছে পানিবন্দী লাখো মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বানভাসি মানুষদের মাঝে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৩শ শুকনা প্যাকেট খাবার, ১৯৭ টন চাল ও নগদ ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবেই কম।

এদিকে মঙ্গলবার তিস্তা নদীর পানি কমে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৫ সে. মি. নিচ দিয়ে ও ধরলা নদীর পানি কুলাঘাট পয়েন্টে বেড়ে বিপৎসীমার ১১০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলার কুলাঘাট পয়েন্টে এখনও রেডঅ্যালার্ট বহাল রয়েছে। সারাদেশের সাথে লালমনিরহাটের তৃতীয় দিনের মতো রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

তিস্তা ও ধরলার প্রবল স্রোতে মঙ্গলবার ভোরে অর্ধ-শতাধিক বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। এই নিয়ে গত ৫ দিনে ধরলা ও তিস্তায় বিলীন হয়েছে ২৭৩টি বসতবাড়ি। বানভাসি লোকজন অভিযোগ করে বলেছেন, গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে থাকলেও তারা পাননি তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা। অনাহারে ও অর্ধাহারে কাটছে তাদের দিন। সরকারিভাবে যে ত্রাণ ও শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম।

কুলাঘাট গ্রামের বানভাসি জহিরন বেওয়া (৬৪), হেলাল উদ্দিন (৫৬), অখিল চন্দ্র (৬৭) জানান, তারা গত ৫ দিনে কোনো ত্রাণ সামগ্রী পাননি। কোনো চেয়ারম্যান-মেম্বারও তাদের খোঁজ খবর নেননি।

একই অভিযোগ করেন আদিতমারির গোবর্ধন চরের নয়া মিয়া (৫৫), আলহাজ আলীসহ (৬২) অনেকেই। তাদের অভিযোগ ৫ দিনের মধ্যে তারা একদিন মাত্র শুকনো খাবার পেয়েছেন। বাকি চার দিনে কেউ তাদের খোঁজ খবর নেননি।

কথা হয় সদরের রাজপুর ও খুনিয়াগাছ এলাকার আবু সাইদ, লোকমান মিয়া, বেলাল চণ্ডীসহ অর্ধশত লোকজনের সাথে। তারা বলেন, ‘বাড়িতে কোমর পানি, গরু ছাগল নিয়ে স্কুলের বারান্দায় ৫ দিন ধরে রয়েছি। মাত্র একদিন শুকনা খাবার পেয়েছি। এটাই শেষ! আর বাকি ৪ দিন ধরে একবেলা খেয়ে সারাদিন রাত চলছে। ক্ষুধার কষ্ট আর সহ্য করতে পানছি না।’

এদিকে বন্যা দুর্গত এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। গত দুই দিনে ৩৫ জন ডায়রিয়া রোগী সদর ও আদিতমারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সির্ভিল সার্জন ডা. আমিরুজ্জামান।

অন্যদিকে মঙ্গলবার সকালে কালিগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ১৫শ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। ত্রাণ বিতরণকালে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুঃখ, দুর্দশা লাঘবের জন্য বদ্ধপরিকর। বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে ইতিপূর্বেও সরকার ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে ‘

এছাড়া সদরের কুলাঘাট ও বড়বাড়ি এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকশ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. শফিউল আরিফ জানান, সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত বন্যা কবলিতদের মাঝে ৯ হাজার ৩শ শুকনা প্যাকেট খাবার, ১৯৭ টন চাল ও নগদ ৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

x

Check Also

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ‘বলিষ্ঠ ও দ্রুত’ পদক্ষেপ চান ট্রাম্প

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ‘বলিষ্ঠ ও দ্রুত’ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ...