নির্বাচন ঘিরে আ.লীগ নেতাদের দূরত্ব বাড়ছে

আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের দল গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তাই নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বগুলোও এখন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।

বেশির ভাগ আসনেই রয়েছে এমপিদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিস্তর দূরত্ব। নগর কমিটির শীর্ষ নেতারা অনুপস্থিত থাকছেন দলীয় কর্মসূচিতে। সাংগঠনিকভাবে আরও দুর্বল অবস্থা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের। চট্টগ্রামে জাসদ ও তরীকতের একজন করে সংসদ সদস্য থাকলেও সাংগঠনিকভাবে দল দুটি দুর্বল।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে কেন্দ্র থেকে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরউদ্দীনকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর কমিটির মেয়াদ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই করাকে কেন্দ্র করে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন ও বর্তমান মেয়র নাছির বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছেন। চট্টগ্রাম নগরের তিনটি আসনের বর্তমান সংসদ সদস্যদের কাউকেই চাচ্ছেন না মহিউদ্দিন।

অন্যদিকে কোতোয়ালি আসনের সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু ও বন্দর আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফের সঙ্গে নাছিরের সম্পর্ক বেশ ভালো। ডবলমুরিং আসনের সংসদ সদস্য আফছারুল আমিনের সঙ্গেও বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে মহিউদ্দিনের।

অভিযোগ উঠেছে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের গোছানোর কাজ শুরুর পর থেকে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পাওয়া নেতারা দলীয় কর্মসূচি এড়িয়ে চলছেন। মন্ত্রী-এমপিরা সভায়ও আসেন না। তাদের সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে তৃণমূলেরও। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা।

মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত দুই এমপি বন্দর-পতেঙ্গা আসনের এম এ লতিফ ও ডবলমুরিং-পাহাড়তলী আসনের ডা. আফছারুল আমীন।
সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং লতিফ কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। তাদের দুজনের সঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীরও বিভিন্ন কারণে দূরত্ব রয়েছে।

গত ২৩ জুন নগরের জেলা পরিষদ মিলনায়তনে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম মহানগর শাখার আলোচনা সভায় মহিউদ্দিন চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন তারা সভায় আসেন না, দলের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন না। সাধারণ স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং তারা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। তারা যদি পদ-পদবি ছেড়ে না দেন তাহলে মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করবে।’

অপর এক আলোচনা সভায় সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, দলের পদ-পদবি বহন করে যারা দলের কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত থাকেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হবে।

দলীয় সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অনুপস্থিত বেশ কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতিফ, ডবলমুরিং-পাহাড়তলী আসনের সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমিন, সীতাকুণ্ড ও নগরের একাংশ নিয়ে গঠিত আসনের সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম প্রমুখ।

গত ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা ওই নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আনেন। আবার জাপা ও জাসদের আসনেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। এমপি দিদারুল আলমের দলীয় পদ নেই। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তিনি এমপি হন আওয়ামী লীগ থেকে। এছাড়া সাতকানিয়া-লোহাগাড়া থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথম এমপি হন জামায়াত ঘরানার হিসেবে পরিচিত আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী। তার বিরুদ্ধে দলের তৃণমূলের নেতাদের অভিযোগ বিস্তর। নদভীর শ্বশুর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা।

তবে অভিযুক্ত নেতাদের দাবি নিজেদের এলাকায় দলীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন তারা। এছাড়া সংসদ অধিবেশন ও সরকারি নানা কাজের ব্যস্ততায় তারা মাঝে মাঝে কর্মসূচিতে উপস্থিত হতে পারেন না।

এদিকে, এম এ লতিফ টানা দুবার এমপি হলেও আগে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। ২০০৮ সালে প্রথম এমপি হওয়ার পর ২০১৩ সালের নভেম্বরে মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে লতিফ সদস্য হন। বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত হয়েছেন এই সংসদ সদস্য। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিভিন্ন কারণে দূরত্ব রয়েছে।

সর্বশেষ গত ১ জুলাই চট্টগ্রাম নগরে এক আলোচনা সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নূরুল ইসলাম বিএসসি সাহেব মন্ত্রী হয়েছেন, তিনি নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি দলের কর্মসূচিতে আসেন না। আফছারুল আমিন সাহেব সাবেক মন্ত্রী, এখন এমপি। নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, অথচ তিনিও আসেন না। এম এ লতিফ দুবার এমপি হয়েছেন, তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য, তিনি আসেন না। দিদারুল আলম আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে এমপি হয়েছেন। তাকে দলের কোনো কর্মসূচিতে কখনো দেখিনি। সিডিএর চেয়ারম্যান ছালাম সাহেব দলের কোষাধ্যক্ষ, তিনি আসেন না কেন?

মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘মহানগরীতে যে ছয়টি আসন আছে, একজন এমপিও দলের তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা নন। তারা পরগাছা। তারা শুধু নিজেরটা প্রচার করেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রচার করেন না। তৃণমূলকে জাগাতে হলে পরগাছাদের বিদায় করে সত্যিকারের ত্যাগী এবং আওয়ামী লীগের অন্তপ্রাণ নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে মহানগর কমিটির সহসভাপতি সংসদ সদস্য আফছারুল আমিন বলেন, ‘সংসদ অধিবেশন ও সংসদীয় কমিটির সভার কারণে অনেক সময় চট্টগ্রামে আসা সম্ভব হয় না। কমিটিতে নয়জন সহসভাপতি আছেন। দুয়েকজন সভায় অনুপস্থিত থাকলে সাংগঠনিক কাজে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা না। তাছাড়া নগর কমিটির মেয়াদ তিন বছর। এখন কমিটির বয়স তিন বছর নয় মাস চলছে। কমিটির সদস্যরা অযোগ্য হলে সম্মেলন দিয়ে দিলেই পারে।’

আরেক অভিযুক্ত সংসদ সদস্য এম এ লতিফ বলেন, ‘নিজের সংসদীয় এলাকায় কর্মসূচি পালন করি। দলের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সাধারণের মধ্যে প্রচার করছি। বর্ধিত সভাসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে যাই।’

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরউদ্দীন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত। সম্প্রতি প্রতিনিধি সভায় তা প্রমাণিত হয়েছে। যারা দলীয় কর্মসূচিতে আসেন না তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কেন্দ্রের কাছে লিখিত জানাব।’

x

Check Also

সোমবার সকালের মধ্যেই রেল চলাচল স্বাভাবিক করা হবে : রেলমন্ত্রী

  রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেছেন, আগামীকাল সোমবার সকালের মধ্যেই পৌলী রেল সেতু মেরামত করে রেল ...