মহেশখাল : পাঁচ কোটি টাকার বাঁধে হাজার কোটি টাকা ক্ষতি

হালিশহর কে-ব্লকের বাসিন্দা ফাতেমা রশিদ। বাড়ির নিচতলায় পার্কিংয়ে থাকা তার গাড়িটি ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ও পরবর্তীতে নিম্নচাপের বৃষ্টিতে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, গোসাইলডাঙা, ছোটপুল, শান্তিবাগ, বেপারীপাড়া, মিস্ত্রীপাড়া, হালিশহর কে-ব্লক, এল-ব্লক, জি-ব্লক, বসুন্ধরা, সোনালী, কর্ণফুলী আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের আর্থিক ক্ষতির সাথে পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। মহেশখালের বাঁধ কাটার পরও সেই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি নেই তাদের।
এসব এলাকার বিভিন্ন ভবনের নিচতলার বাসিন্দাদের আসবাবপত্র ডুবে যাওয়ায় তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। পানিতে ডুবে ঘরের ফার্নিচার, ব্যবহৃত গাড়ি, দোকানদারদের মালামাল কিংবা মূল্যবান ফার্নিচার যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি সিটি করপোরেশনের রাস্তাঘাট ভেঙে কিংবা খালের ভেতরে মাটি ভরাট হয়ে ৫ কোটি টাকার বাঁধে প্রায় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে -এই আশঙ্কায় মহেশখালে বাঁধের বিরোধিতা করে শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘টাকার অঙ্কে ক্ষয়ক্ষতি হাজার কোটি টাকার ওপরে হবে। এর পাশাপাশি রয়েছে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। বাঁধের কারণে আটকে থাকা পানিতে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহার্য টিভি, ফ্রিজ, ফার্নিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষ কাজে যেতে না পেরে অভুক্ত থেকেছে। গত বছর এই এলাকার মানুষকে পানির মধ্যে ঈদ করতে হয়েছে। অপরিকল্পিত এ বাঁধের কারণে বিশাল একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স’বির হয়ে গেছে।’
সুজন প্রশ্ন রাখেন, ‘অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে এ এলাকার মানুষের বিশাল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যে দুর্ভোগ হলো, এর দায়ভার কে নেবে?’
মহেশখালের ওপর বাঁধ দেওয়ার কারণে খালের উভয়পাশের(ভাটি ও উজান) মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। প্রবল জোয়ারে ভাটি এলাকার মানুষ পানিবন্দি হন। আবার টানা বৃষ্টিতে পানি নামতে না পারায় দুই থেকে চারদিন পর্যন্ত পানিবন্দি হয়েছেন উজানের মানুষ।
এ বিষয়ে বন্দর পুরাতন পোর্ট মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাকিম সওদাগর বলেন, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের সময়ও এই এলাকায় পানি ওঠেনি। কিন’ বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বাঁধ দেওয়ার পর থেকে দুই বছর ধরে অতিরিক্ত জোয়ারে মার্কেট এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে যায়। এতে পোর্ট মার্কেটের ব্যবসায়ীদের প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
হালিশহর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা করছিলেন শারমিন জাহান রুহী। ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ও পরবর্তী সময়ের বৃষ্টির দুই দফা পানিতে তার দোকানের সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে সমগ্র এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বড় ব্যবসায়ীরাও।
আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের উভয়পাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশত ফার্নিচারের দোকান। আখতার, ব্রাদার্স, ফ্রিডম, লিগেসি, হাতিল, জেএমজি, আয়েশা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অসংখ্য ফার্নিচার দোকান এখন এই রোডে। কিন’ মহেশখাল বাঁধের কারণে গত দুই বছর ধরে এখানকার অনেক ফার্নিচার দোকানে পানি তো ঢোকেই, সেই সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে থাকে পুরো রোডটি।
এ বিষয়ে হাতিল ফার্নিচারের ম্যানেজার আবদুস সালাম বলেন, ‘রাস্তায় পানি থাকার কারণে বিক্রির ভরা মৌসুমেও ক্রেতা আসছেন না। একইসাথে কাছের ক্রেতারা যারা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের কারো অফিসের আবার কারো ঘরের আসবাব পানি জমে নষ্ট হয়েছে। এর ফলে এই খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
মহেশখাল বাঁধের কারণে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে দীর্ঘসময় ধরে এলাকা পানিবন্দি থাকছে এবং এখন জোয়ারের সময় রাস্তায় পানি জমছে বলে জানান দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এইচ এম সোহেল। সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘এভাবে একটি এলাকা চলতে পারে না। বাঁধের কারণে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হয়েছে, তা হলো- নালা ও খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। পানিতে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতো বলে এলাকাটি দুর্গন্ধময় হয়ে থাকতো।’
তিনি আরো বলেন, ‘এভাবে বাঁধ কাটা ও বাঁধ দেওয়ার মধ্যে সমাধান নেই। স্লু্ইস গেইট দিলেও সমাধান হবে না, যদি তা মেইনটেনেন্স করা না যায়। তাই আমাদের দাবি থাকবে, পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে স্লুইস গেইট চালু করা হোক।’
স’ানীয় ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরো এলাকার প্রায় ৫০ হাজার পরিবার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রতিটি পরিবারে এক লাখ টাকার ফার্নিচার ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাতে মোট প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি। এর বাইরে অনেকের গাড়িও নষ্ট হয়ে গেছে।
মহেশখালে পাওয়া যাচ্ছে ম্যাট্রেস
মহেশখাল থেকে মাটি উত্তোলনের কাজ করছে সিটি করপোরেশনের বিশেষ টিম। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্দেশে পুরো খাল থেকেই মাটি তোলা হচ্ছে। মাটি ওঠাতে গিয়ে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার পেছন থেকে এ পর্যন্ত ১২টি ম্যাট্রেস ওঠানো হয়েছে বলে জানান সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ বসাক।
সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘খালপাড়ের বাসিন্দারা মনে করেন, খালটি সব আবর্জনার ভাগাড়। অনেকেই ম্যাট্রেসসহ সব ধরনের আবর্জনা খালে ফেলছেন এবং এতে করে ভরাট হয়ে যাচ্ছে খালটি। গুটিকয়েক মানুষের জন্য সমগ্র এলাকার মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।’
এ বিষয়ে দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এইচ এম সোহেল বলেন, ‘মানুষের জনসচেতনতা না বাড়লে এ অবস’া থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’
খালের মাটি তুলতে খরচ হবে প্রায় ১০ কোটি টাকা
বাঁধ দেওয়ার কারণে গত দুই বছর ধরে মহেশখাল স্রোতহীন ছিল। এর ফলে খালের উজানে একদিকে ফইল্যাতলী বাজার, অন্যদিকে রামপুরা, গোসাইলডাঙা ও শান্তিবাগ পর্যন্ত খালটির সাথে যুক্ত শাখা-প্রশাখার সবগুলো নালা ভরাট হয়ে গেছে।
এসব শাখা খাল ও নালা থেকে মাটি তুলতে কী পরিমাণ টাকা খরচ হতে পারে -এমন প্রশ্নের জবাবে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ বসাক বলেন, ‘খালের মাটি অপসারণে আগে থেকে কোনো ধারণা করা যায় না। খালে যদি স্কেভেটর নামতে পারে; আর তা যদি ভালো করে মুভমেন্ট করতে পারে এবং দ্রুত যদি মাটি সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আর্থিক খরচ কমে আসে। তবে মনে করা হচ্ছে, মহেশখালটি স্বাভাবিক অবস’ায় ফিরিয়ে আনতে এর সাথে যুক্ত সব খাল ও নালা পরিষ্কারে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে।’
বন্দরের তেল পুড়তো মাসে তিন লাখ টাকার
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে নির্মিত এ বাঁধে পাহাড়ায় ছিল প্রতি শিফটে ৩ জন করে আনসার। তিন শিফটে ৯ জন আনসার এখানে কাজ করেছে। প্রতিজন আনসারের বেতন গড়ে মাসে ১৫ হাজার টাকা ধরে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ২২ মাসে বেতন বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। একইসাথে বাঁধের মধ্যে থাকা স্লুইস গেইটগুলো অপারেটিংয়ের জন্য প্রতি শিফটে দুইজন কর্মচারী ডিউটি করতো। বন্দরের এসব কর্মচারীর স্কেল হিসেবে বেতন হওয়ায় তাদের কারো ৩০ হাজার টাকা আবার কারো ২৫ হাজার টাকাও বেতন হয়। ২৫ হাজার টাকা দরে তিন শিফটে কাজ করেছে ৬ জন। তাহলে ৬ জনের মাসে বেতন খরচ হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা; ২২ মাসে খরচ হয়েছে ৩৩ লাখ টাকা। এতসব আর্থিক ক্ষতির সাথে প্রতিমাসে পাম্প চালাতে গিয়ে পোড়াতে হতো তিন লাখ টাকার ডিজেল।
ক্ষতির প্রশ্নে মেয়রের বক্তব্য
মহেশখালের বাঁধ কাটার দিন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাঁধের কারণে যেসব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা ক্ষতিপূরণ পাবে কি-না? জবাবে মেয়র বলেন, ‘বাঁধের আগেও এখানকার মানুষ পানিবন্দি থাকতো। বাঁধের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পানি জমতো। এতে স’ানীয়রা সুবিধা-অসুবিধা দুটোই ভোগ করেছে। তাই এখানে ক্ষতিপুরণের প্রশ্ন সেভাবে আসবে না। তবে বাঁধের কারণে খালটি উজানে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পুরো খাল ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে।’
উল্লেখ্য, বর্ষাকালে স্বাভাবিক জোয়ারে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলো দিনে দু’বার জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছিলো। এই অবস’া থেকে উত্তরণ ঘটাতে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ স’ানীয় বিভিন্ন সেক্টরের প্রতিনিধিদের চাপে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ করে বন্দর রিপাবলিক ক্লাবের পাশে মহেশখালে বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম উদ্বোধন করে ২০১৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর। উজানের পানি নেমে যেতে বাঁধের মধ্যে গেইট সম্বলিত ১০টি পাইপ, একটি ১০ ফুট চওড়া বাইপাস ও ৫টি পাম্প বসানো হয়।
কিন’ বাঁধ স’াপনের পর থেকে বৃষ্টি হলেই আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ উজানের বিভিন্ন এলাকা পানিবন্দি থাকছে। সর্বশেষ গত মাসের শেষদিনের ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ও মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রবল বর্ষণে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিশাল এলাকার মানুষ পানিবন্দি ছিল।
এই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করতে গত ১৩ জুন বাঁধটি কেটে দেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এ সময় বাঁধ নির্মাণকারী সংস’া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবালও উপসি’ত ছিলেন।

x

Check Also

ফখরুলকে ধন্যবাদ দিলেন কাদের

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোয় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ...