পার্থক্যটা বুঝিয়ে দিলেন মাশরাফিরা

সম্প্রতি আইসিসি বোর্ড সভায় পাশ হওয়া নতুন গঠনতন্ত্রে প্রস্তাবিত একটি বিষয় ছিল, দ্বি-স্তর বিশিষ্ট টেস্ট সিস্টেম চালু করা। সিস্টেমটির মূল প্রতিপাদ্য, র‌্যাংকিংয়ের শেষ দুটি দেশকে রেলিগেশনের মধ্যে ঠেলে দেয়া। শেষ দুটি দেশকে খেলতে হবে আইসিসি সহযোগি দেশগুলোর সঙ্গে। সেখান থেকে উঠে আসতে পারলে কদাচিৎ খেলার সুযোগ পাবে টেস্ট খেলুড়ে সেরা আটটি দেশের সঙ্গে।

বাংলাদেশ এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত পাশ হওয়া নতুন গঠনতন্ত্র থেকে সেই প্রস্তাবটি বাদ দেয়া হয়েছে। দ্বি-স্তর বিশিষ্ট টেস্ট সিস্টেম নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা এবং বিতর্ক, তখন আয়ারল্যান্ড এবং আফগানিস্তানের অবস্থান ছিল এর পক্ষে। শর্তসাপেক্ষে তাদের টেস্ট খেলা মর্যাদা পাওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হয়েছিল। দেশ দুটি নিজেদের পক্ষে যুক্তি ‍তুলে ধরেছিল। দৃঢ়তার সঙ্গে বলে আসছিল, বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে থেকে শুরু করে টেস্ট খেলুড়ে অন্য অনেক দেশকেও হারানোর ক্ষমতা রাখে তারা।

তবে, দ্বি-স্তর বিশিষ্ট টেস্টের প্রস্তাব পাশ করতে না পারলেও, বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে ঠিকই আইসিসির মোড়লরা সিস্টেমটি চালু করে দিতে পেরেছেন। ১০ দেশের বিশ্বকাপের নিয়ম চালু করে দিয়ে তারা জানিয়েছে, র‌্যাংকিংয়ের সেরা আট দেশ খেলবে সরাসরি বিশ্বকাপে। বাকি দুটি দল বাছাই পর্বের মাধ্যমে উঠে আসতে হবে। বাছাই পর্বে টেস্ট খেলুড়ে দুটি দেশকে খেলতে হবে আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড, হল্যান্ড কিংবা নেপালের মত দেশের বিপক্ষে।

আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের এখন যে অবস্থান (সপ্তম), তাতে আগামী বিশ্বকাপ সরাসরি খেলা মাশরাফিদের জন্য প্রায় নিশ্চিত। অলৌকিক কিছু ঘটে না গেলে, এই সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজেই সেটা নিশ্চিত হওয়ার কথা। শুধু শর্ত ছিল আয়ারল্যান্ডকে দুই ম্যাচেই এবং অন্তত এক ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে হবে। তাহলে র‌্যাংকিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে ৬ নম্বরে উঠে আসবে বাংলাদেশ।

কিন্তু বেরসিক বৃষ্টি প্রথম ম্যাচে আইরিশদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচটি শেষ করতে দিল না। দারুণ সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতির রুদ্ররোষের কারণে বাংলাদেশ বঞ্চিত হলো কাংখিত মাইলফলক অর্জন করা থেকে। দ্বিতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ভাগে পেয়েও জিততে পারেনি মাশরাফিরা।

তৃতীয় ম্যাচে এসে দ্বিতীয়বারেরমত মুখোমুখি আয়ারল্যান্ডের। নিজেদের মাটিতে বাংলাদেশকে মোকাবেলা করবে আইরিশরা। বাংলাদেশ যতই ফেবারিট হোক, নিজেদের মাটিতে স্বাগতিকরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তারওপর ‘হারানোর কিছু নেই’- এমন মানসিকতা নিয়ে একটা আন্ডারডগ অবস্থান আইরিশদের। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ছোট দলও বড় বড় দলকে হারিয়ে দিতে পারে। শুধু ক্রিকেটই নয়, ফুটবল থেকে শুরু করে সবগুলো খেলাতেই এটা চিরন্তন সত্য।

কিন্তু র‌্যাংকিংয়ে আয়ারল্যান্ড যে বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে সেটা মাঠে আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেলো। বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার শঙ্কা ছিল আজকের ম্যাচটিও। মালাহাইদের দ্য ভিলেজ স্টেডিয়ামের আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল ঠিক, তবে ভালোয় ভালোয় ম্যাচটি শেষ করা গেছে।

শেষ হয়েছে মূলতঃ পুরো ম্যাচের তিন ভাগের দুই ভাগ খেলার কারণে। বাকিটা খেলতেই হয়নি। টস হেরে ব্যাট করতে নামা আয়ারল্যান্ডকে বাংলাদেশ অলআউট করে দিয়েছে ৪৬.৩ ওভারে। অলআউট হওয়ার আগে ১৮১ রান করতে সক্ষম হয়েছে আইরিশ ব্যাটসম্যানরা।

জবাবে বাংলাদেশ খেলেছে মাত্র ২৭.১ ওভার। ২ উইকেট হারিয়ে অনায়াসেই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। পুরো ম্যাচে মোট খেলা হয়েছে ১০০ ওভারের জায়গায় ৭৩.৪ ওভার। আরও ২৬.২ ওভার খেলতেই হয়নি। অন্তত ২ ঘণ্টা আগে ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে।

আয়ারল্যান্ড যতই নিজেদের মাটিতে খেলুক, যতই দলটিতে অভিজ্ঞ কিংবা কাউন্টিতে খেলা ক্রিকেটার থাকুক, বাংলাদেশ যে সত্যি সত্যি অনেক এগিয়ে গেছে, অন্তত ওয়ানডে ফরম্যাটে তার প্রমাণ এই ম্যাচ। উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড, এড জয়সে, কেভিন ও’ব্রায়েন, নেইল ও’ব্রায়েন, পল স্টার্লিংরা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশকে চেনে। এই চেনার বয়স অন্তত ১০ বছর, সেই ২০০৭ বিশ্বকাপ থেকে।

সেবার বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বে বাংলাদেশকে হারিয়ে দিয়েছিল তারা। এক দশকের ব্যবধানে আইরিশরা নিজেদের ঘরের মাঠেই প্রত্যক্ষ করলো, বাংলাদেশ কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। দশ বছর আগে তামিম, সাকিব, মুশফিক কিংবা মাশরাফিদেরও পেয়েছিল তারা। ১০ বছর পর এ চারজন বাংলাদেশ দলে রয়েছেন; কিন্তু পোর্টারফিল্ড-জয়েসেদের সঙ্গে সাকিব-তামিমদের ব্যবধান তৈরি হয়েছে কতটা, সেটা সামনে থেকেই প্রত্যক্ষ করলো আয়ারল্যান্ড।

আইসিসি সহযোগি দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান কিংবা আয়ারল্যান্ড খুবই শক্তিশালি। তারা উঠে আসছেও দ্রুত; কিন্তু বাংলাদেশকে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করে বসাটা যে তাদের কতটা ভুল, সেটা এই ম্যাচেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো মাশরাফিরা। এই ম্যাচেই টিম বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিল, তাদের সঙ্গে আইসিসি সহযোগি দেশগুলোর পার্থক্য আসলে কোথায়!

Check Also

ম্যানচেস্টারে হামলা, আইএস সমর্থকদের উল্লাস

প্যারিসে ফুটবল স্টেডিয়ামের বাইরে হোক কিংবা মধ্যরাতের নিস, বারবার সন্ত্রাস আতঙ্কে কেঁপেছে ইউরোপ। নাশকতায় রক্তাক্ত …