সাংবাদিকের কলম বন্ধে রকমারি মামলা

প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা মামলা দিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির প্রবণতা বেড়েই চলছে। ভুক্তভোগী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কেবল ৫৭ ধারা নয়, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও জালিয়াতির অভিযোগ এনেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে সাধারণ স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও করপোরেট অফিসগুলো সমানভাবে এগিয়ে রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পরও মূলত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আইনের এমন অপব্যবহার করছে স্বার্থন্বেষী মহল।  মামলা করার এই প্রবণতাকে  গণতন্ত্র ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের পথে প্রতিবন্ধক বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক নেতারা।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ করায় বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউনের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি নয়ন খন্দকারকে মিথ্যা মামলার আসামি করা হয়।

এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর পাইকপাড়া গ্রামের শ্বশুর বাড়ি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ বিষয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলমকে আটক করেন থানার এএসআই  তৌহিদুর রহমান। এরপর তাকে থানা হেফাজতে চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করার খবর বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত হলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ধরনা দেন তৌহিদ। ওই শিক্ষার্থীর কাছে কাছে মোবাইল ফোনে ক্ষমাও চেয়ে নেন। সেই খবরও বাংলা ট্রিবিউনে গুরুত্বসহ প্রকাশিত হয়। এরপর ওই এএসআই তৌহিদের শাস্তিমূলক বদলি হয়। এই  সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ওই সময়ই সাংবাদিক নয়ন খন্দকার ও আরিফ মোল্লাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন ওই এএসআই।

এ ঘটনার কয়েকদিন পর বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী টিপু সুলতানের মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যায় ফয়লা গোরস্থান পাড়ার জিহাদ নামের এক যুবক। এ ঘটনায় টিপু সুলতান ঝিনাইদহ ডিবি অফিসে অভিযোগ দিলে পুলিশ গত ১২ নভেম্বর বিকালে অভিযান চালিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে টিপু সুলতানের জিম্মায় ফিরিয়ে দেয়। এরপর জিহাদের ভাই মাজেদুল বাদী হয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বাসার আসবাবপত্র ভাঙচুর, স্বর্ণালঙ্কারসহ টাকা লুটের অভিযোগ করা হয়। ওই মামলায় পুলিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে সাংবাদিক নয়ন খন্দকার ও আরিফ মোল্লাকে আসামি করে। অথচ ওই ঘটনায় তারা জড়িত ছিলেন না বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেন।

মামলা দায়েরের কয়েকদিন পরই নয়ন খন্দকার ও আরিফ মোল্ল্যা জামিন পান। অবশ্য ওই মামলা থেকে পুলিশ সাংবাদিক নয়ন খন্দকারের নাম বাদ দিয়ে বাকি আসামিদের নামে আদালতে চার্জশিট দেয়।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার এসআই মাহফুজ হোসেন বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত কোনও রেশারেশি থেকে এই মামলার তদন্ত করিনি। সাক্ষ্যপ্রমাণে যা পেয়েছি, তাই করেছি। তাদের বিরুদ্ধে ফৌজাদারি আইনের ৩২৩ ও ৩৮০ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। যখন পুলিশের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা রিপোর্ট করেছিলেন,  তখন আমি এই থানায় ছিলাম না।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতফরের (মাউশি) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় গত বছরের ২৯ আগস্টে দৈনিক শিক্ষার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্টে মামলা হয়। সিদ্দিকুর রহমান খানকে গ্রেফতারের পর পুলিশ রিমান্ড আবেদন করলে তাকে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন আদালত। একসপ্তাহ পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

একই বছর ৮ আগস্ট গুজব ছড়ানোর অভিযোগে নিউজ পোর্টাল বাংলামেইলের মালিক ও প্রকাশক ও সম্পাদকসহ তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। ওই দিন রাতেই নিউজ পোর্টালটির কার্যায় বন্ধ করে দেয় র‌্যাব-৩। একসপ্তাহ পর জামিনে মুক্তি পান ওই তিন সাংবাদিক।

২০১৫ সালে পুলিশের বিরুদ্ধে সংবাদ করায় পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের আরেক প্রতিনিধি মৌলভীবাজারের সাইফুল ইসলাম। ওই সময় তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনতা ও মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পাতাকুঁড়ির দেশের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। ওই দুই পত্রিকায় ‘শ্রীমঙ্গল থানার ওসির বিরুদ্ধে হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ করায় ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল শ্রীমঙ্গল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে থাকা পুলিশের একটি দল তাকে আটক করে। পরদিন ২৪ এপ্রিল বিকালে গাড়িতে পেট্রোল হামলা ও পুলিশকে আক্রমণের দুই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ৩৮ দিন কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।

এ ঘটনায় সাংবাদিক সাইফুল ইসলামের স্ত্রী বাদী হয়ে ওসি জলিলসহ ছয় জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এই মামলার তদন্ত শেষে আসামিদের পক্ষেই প্রতিবেদন দাখিল করে ডিবি পুলিশ। এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদী নারাজি দিলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলার তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। পিবিআই-ও আসামিদের পক্ষে প্রতিবেদন জমা দেয়। বাদী আবারও নারাজি দেন। এরপর ওই মামলা মৌলভীবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি খারিজ করে দেন। পরে বাদী মৌলভীবাজার দায়রা জজ আদালতে ওই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য আবেদন করেন। ওই আবেদন  প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট প্রবীর সিকদারকে আসামি করে ফরিদপুর কোতোয়ালী থানায় তথ্য ও যোগেোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করেন জেলা পূজা উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা স্বপন পাল। এজাহারে বাদী বলেন, প্রবীর সিকদার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ১০ আগস্ট বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে ‘আমার জীবন শঙ্কা তথা মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী থাকবেন’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে দায়ী হিসেবে তিনজনের নাম উল্লেখ করে এক নম্বরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম দেন। এরপর ১৬ আগস্ট রাতে প্রবীর সিকদারকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে ওই রাতেই ফরিদপুর নিয়ে যায়। পর দিন পুলিশের আবেদনে তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এরপর ১৯ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।

প্রবীর সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারাটি মূলত সাংবাদিকদের শায়েস্তা করার জন্যই করা হয়েছে। এমন কঠোর আইনের দরকার নেই। সাংবাদিকরা কোনও ভুল করলে তার জন্য অনেকভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। অবিলম্বে এই আইন বাতিল করা দরকার। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো না।’

রংপুরে পুলিশের গ্রেফতার বাণিজ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির ‘অপরাধে’ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার পীরগাছা উপজেলা প্রতিনিধি হারুনুর রশীদকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বানিয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা দেয় পুলিশ। একইসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে হামলা, আগুন দেওয়া ও নাশকতার তিন মামলার চার্জশিটেও তার নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এসব মামলায় তাকে তারিখ অনুযায়ী আদালতে হাজিরা দিতে হয়।

হারুনুর রশীদ জানান, ‘স্থানীয় পুলিশ আমাকে হয়রানির উদ্দেশ্যেই এই মামলা দায়ের করে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে প্রতিকার চেয়েও পাইনি।’

পুলিশ কর্মকর্তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করায় গত ১৩ মার্চ দৈনিক টেলিগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক ও যশোর প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি বিনয়কৃষ্ণ মল্লিককে তুলে নিয়ে পুলিশ। এরপর নরসিংদীতে একটি প্রতারণার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হলে সাংবাদিকদের আন্দোলনের মুখে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এদিকে খুলনায় গত বছরের মে মাসে দৈনিক মানবজমিনের সাংবাদিক নুর ইসলামের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। গত বছরের ১৭ জুন যশোরের সাংবাদিক দিগন্ত টিভির প্রতিনিধি তারিকুল ইসলাম তারেককে গ্রেফতার, একই বছরের ২০ জুন অপরাধের কণ্ঠ-এর যশোর প্রতিনিধি মশিউর রহমানকে রিমান্ডে নেওয়া হয়। দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান আব্দুর রাজ্জাক রানাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়রানি করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। দৈনিক খুলনা অঞ্চলের যশোর ব্যুরো প্রধান এম আইয়ুব বলেন, ‘গ্রেফতার এড়াতে গত বছরের ৪ রমজান থেকে ১৮ দিন আমাকে এলাকা ও পরিবার ছেড়ে  থাকতে হয়েছে।’

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, চলতি বছরের প্রথম চারমাসে অন্তত ৯ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে শুধু পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। সর্বশেষ ওয়ালটনের পণ্যের মান নিয়ে রিপোর্ট করায় নতুনসময়ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজুর বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করে ওই কোম্পানি। এরমধ্যে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় রমনা থানায় একটি, অন্যটি চাঁদাবাজির মামলা পল্টন থানায়। তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়ালটনের সঙ্গে সাংবাদিক নেতারা বৈঠক করে বিষয়টি মীমাংসা করেন।

আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী,  ২০১৬ সালে ১১৭ জন সাংবাদিককে হয়রানি-নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯জনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হুমকি দিয়েছেন। ৯জনকে হত্যার হুমি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে  সরকারদলীয় নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সরকারি আমলা, সন্ত্রাসী ও অপরিচিত মোবাইল নম্বর থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ২০ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে  মামলা দায়ের করা হয়েছে।  ৩৭ জনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১জন। দুই সাংবাদিককে আমলারা নির্যাতন করেছেন। চার সাংবাদিক কারারক্ষীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৫ জন বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাব অনুযায়ী এ সময়ের মধ্যে ১২১ জন সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ১১ জনকে নির্যাতন করা হয়েছে। একজনকে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় মামলাও হয়েছে একাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে এমন মামলার বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে। ৫৭ ধারা মানবতাবিরোধী। শুধু সাংবাদিকরাই এই মামলার শিকার হচ্ছে না, মানবাধিকারকর্মীরাও হচ্ছেন। যারা যুক্তি উপস্থাপন করে লেখালেখি করেন, তাদের বিরুদ্ধেও এই ধারার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এটি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বড় বাধা।’

x

Check Also

সংবাদ সম্মেলনে তথ্যঃঅরবিস ফ্লাইং আই হসপিটাল’ এখন চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে

হোসেন বাবলা:১৭নভেম্বর বিশ্বের একমাত্র অরবিস ফ্লাইং আই হসপিটাল’ এখন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বৃহস্পতিবার ...