পাচারের অর্থে বিদেশে গাড়ি বাড়ি ব্যবসা

প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বায়নের এই যুগে পুরো পৃথিবী হয়ে গেছে একটি গ্রাম। দেশের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করতে। পাচারকৃত সেই অর্থ তারা বিদেশের নামিদামি ব্যাংকে সঞ্চিত রাখছেন; বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন এবং বাড়ি-গাড়িসহ ব্যাপক সহায়-সম্পত্তি গড়ে তুলছেন। ব্যাংকিং চ্যানেল ও হুন্ডির মাধ্যমে পাচারকৃত এসব অর্থে তারা বিদেশে গড়ে তুলছেন নিজেদের জন্য বিলাসবহুল ভুবনও। দেশের আইন ভঙ্গ করে এভাবে অর্থপাচারের কারণে রক্তশূন্যতায় ভুগছে আমাদের অর্থনীতি।

এদিকে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে অর্থপাচারের প্রবণতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধভাবে টাকা অর্জনের পথ বন্ধ না হলে এবং দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে অর্থপাচার বাড়বেই।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৯১১ কোটি ডলার বা ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। আর ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। এটি বাংলাদেশের প্রায় দুটি অর্থবছরের বাজেটের সমান। উল্লেখ্য, বর্তমানে বার্ষিক বাজেটের আকার প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন প্রতিরোধ আইন প্রয়োগে ব্যাপক কড়াকড়ির মধ্যেও দেশ থেকে টাকা পাচার অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর বেড়েই চলেছে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে না। উপরন্তু দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক সিস্টেম ব্যবহার করে গত ১০ বছরে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। পাচার হওয়া অর্র্থের ৭০ শতাংশই গেছে এই বৈধ মাধ্যমে। আমদানিতে পণ্যমূল্য বেশি দেখিয়ে এবং রপ্তানিতে পণ্যমূল্য কম দেখিয়ে এ অর্থ পাচার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দশ বছরে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হয়েছে ৪৪ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার। দেশি মুদ্রায় ৩৫ লাখ ৬৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

জিএফআইয়ের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় গত বুধবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, দেশে এন্টি মানি লন্ডারিং আইন আছে। তাই সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া জিএফআই রিপোর্ট যদি সত্য হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান গত বুধবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, অর্থপাচারের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখবে।

গত বছরের জুনে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় টাকা পাচারের পরিমাণ বাড়ছে। গড়ে প্রতিবছর ৪০০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। ২০১৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জমা টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এই টাকার বেশিরভাগই দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী নাগরিক হিসেবে যারা টাকা রেখেছেন এই হিসাব শুধু তাদের।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ থেকে গত চার দশকে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে। যা বাংলাদেশের একটি প্রায় বাজেটের সমান। প্রতিবছর গড়ে পাচার হয়েছে ৮০ কোটি ডলার যা স্থানীয় মুদ্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রায়। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ।

মালয়েশিয়ার সরকার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ২০০২ সালে চালু করে ‘মাই সেকেন্ড হোম’ প্রকল্প। এ প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের তালিকার শীর্ষে রয়েছে চীন। এর পরেই রয়েছে বাংলাদেশের নাম। তিন সহস্রাধিক বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় দ্বিতীয় আবাস গড়ে তুলেছেন। এক্ষেত্রে তারা বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। যা বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। এ তালিকায় আছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলা। মালয়েশীয় সরকারের করা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। এর বাইরে আরো অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যেও বিনিয়োগ হচ্ছে পাচারকৃত অর্থ।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা যায়, অর্থপাচার করে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ে তুলেছেন এমন ১৫ ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম তাদের কাছে রয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জনই রাজনীতিবিদ। অবশিষ্ট ৮ জনের মধ্যে ৭ জনই ব্যবসায়ী।

মালয়েশীয় সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, সেকেন্ড হোম প্রকল্পে কারো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নগদ ৫ লাখ রিঙ্গিত নিয়ে যেতে হবে দেশটিতে, যা প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিয়ে বিদেশে বিনিয়োগ করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন আবশ্যক। বাংলাদেশ এই কাজে এখন পর্যন্ত ৬টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে অবস্থিত। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম ছাড়া যারা দেশের বাইরে অর্থ প্রেরণ করছেন, তা শতভাগই পাচার করা।

বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে টাকা পাচার করা হচ্ছে। পাচার করা টাকায় সিঙ্গাপুরে গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনীতিবিদের নামে সিঙ্গাপুরে মিষ্টির দোকান, রেস্টুরেন্ট ও তেলের পাম্প রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থে কেনিয়ায় গড়ে উঠেছে বড় বড় গার্মেন্টস শিল্প। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশে হোটেল-ব্যবসা করছেন। যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্তে সে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদের বিপুল অর্থ সঞ্চয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। বর্তমানে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমছে। পাশাপাশি দুবছর ধরে বেড়েছে আমদানি-ব্যয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওভার-ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত ক্রয়মূল্য) প্রদর্শনের মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর। কারণ অর্থ একবার পাচার হয়ে গেলে, তা ফেরত আনা আইনগতভাবেই খুব কঠিন। একই সঙ্গে যেসব মাধ্যম হয়ে অর্থ যায়, সেগুলোও জোরদার পর্যবেক্ষণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অবৈধভাবে টাকা অর্জন করলে এবং দেশে টাকা সংরক্ষণে নিরাপদ বোধ না করলে তা পাচার করে দেওয়া হয়। টাকা পাচার রোধে আগে টাকার মালিকদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ আনতে হবে। তাহলে তারা ওই টাকা বিনিয়োগ করবে। বেআইনিভাব টাকা আয়ের পথ বন্ধ করতে হবে। তা হলেই দেশ থেকে অর্থপাচারের প্রবণতা কমবে।

x

Check Also

ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ)হচ্ছে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্যের প্রতীক,সূফি মিজান

হোসেন বাবলা:১৯নভেম্বর বন্দর নগরীতে নগর গাউছিয়া কমিটির উদ্যোগে পবিত্র মাহে রবিউল আউয়াল উপলক্ষে স্বাগত জানিয়ে ...