কে বদলে গেল আওয়ামীলীগ না হেফাজত ? – জনগণ জানেনা, তবে জনগণ এটা জানে অতীত-ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটেছে-ঘটবে তা কারো জন্যই সুখকর কিছু নয় !

২০১৩ সালের ৫ মে সরকারবিরোধী দাবি-দাওয়া নিয়ে ঢাকায় দিনব্যাপী তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলাম। সেদিন রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিদায় নেয় হেফাজতের কর্মীরা। চার বছর পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই হেফাজতে ইসলাম। কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি, পাঠ্যসূচিতে কী থাকবে বা থাকবে না সেই তালিকা দেওয়া থেকে শুরু করে সুপ্রিমকোর্টের সামনের ভাস্কর্য সরানোর দাবি নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন ও গণভবনের অতিথির মর্যাদা পেয়েছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হেফাজতকে জায়গা দেওয়ার কারণে চড়া মাশুল দিতে হবে। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলছে, কেউ অতীত কর্মকাণ্ডের ভুল থেকে সরে আসলে তাদের স্বাগত জানানো উচিত।

কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি ও ধর্ম অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন করাসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। মতিঝিল এলাকায় প্রায় ৮ ঘণ্টা তাণ্ডব চালায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। এতে মতিঝিল এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সমাবেশের জন্য বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সময় বিকাল ৫টার পরও শাপলা চত্বরে থেকে যাওয়ার ঘোষণা দেয় হেফাজতের কর্মীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতে বিজিবি, ব়্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনী মতিঝিলকে ঘিরে অভিযান চালালে পিছু হটে তারা। সেদিন হেফাজতের হামলা থেকে মুক্তি পায়নি গণমাধ্যম কর্মীরাও। ওই ঘটনার ঠিক চার বছর পর সেই হেফাজত  এই একই সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিতে সক্ষম হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা তাদের সুবিধা আদায়ের কৌশল মাত্র, হেফাজত আসলে তার নীতি বদলায়নি।.

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ

২০১৩ সালের সেই শাপলা চত্বর ছাড়ার পর ২০১৫ সালের শেষে দিক থেকে আবারও আলোচনায় আসতে শুরু করে সংগঠনটি। পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন থেকে শুরু করে, সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপন করা থেমিসের ভাস্কর্য সরানোর ভাবনা এবং সবশেষ কওমি মাদ্রাসা সনদের স্বীকৃতি পাওয়া, এসব নিয়ে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের ‘আপোস’ বা সমঝোতা’র সমালোচনা করছেন সুশীল সমাজ ও সাংস্কৃতিক নেতারাও। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজতের বৈঠককে ইতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই। ভুলে গেলে চলবে না, তারা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ বিশ্বাস করে না।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সাক্ষাৎ এবং তাদের চাহিদা রক্ষায় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ পরিস্থিতির পূর্বাভাস হিসেবে দেখলেও খুব বেশি বলা হবে না। এসব মৌলবাদী সংগঠনের সঙ্গে কোনও ধরনের সমঝোতার কোনও সুযোগ নেই।’

এদিকে, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেফাজতের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। হেফাজত হেফাজতের মতোই রয়েছে। হেফাজত তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে।’

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে আজিজুল হক বলেন, ‘দাবি-দাওয়া নিয়ে যে কোনও নাগরিক রাষ্ট্র প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেই পারেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতারা বলছেন হেফাজতের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই। সেক্ষেত্রে সুসম্পর্কের প্রশ্ন অবান্তর। এখন সরকার আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছে। পরে যে সেই অবস্থান বদলে যাবে না সেটাও আমরা মনে করি না।’

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেফাজত নারী বিষয়ে তাদের যে অবস্থান ব্যক্ত করেছে এখনও তারা সেখানেই রয়েছে। মৌলিক কোনও পরিবর্তন তাদের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না তারা কখনও মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করবে, আগেও করেনি। এরকম প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী সংগঠনকে জায়গা করে দেওয়া হিতে বিপরীত হতে পারে।’

তবে আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ তেমনটা মনে করেন না। তিনি হেফাজতের তাণ্ডবকে ‘ভুল’ বলেই উল্লেখ করেছেন। হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজত যে তাণ্ডব করেছিল, সেটা ছিল ভুল পদক্ষেপ। কেন করেছিল তার ব্যাখ্যা তারাই ভালো দিতে পারবে। হয়তো যেটা করতে চায়নি, সেটা হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে মোটেই নমনীয় নয়, মামলাগুলো চলছে।’.

৫ মে’র রাতে হেফাজত

হানিফের মতে, হেফাজত নিজেকে ‘শুধরে’ নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তি বা কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠী অতীতের কর্মকাণ্ডের ভুল থেকে যদি সরে আসে, তাহলে তাদের ওই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো যায়।’

২০১৩ সালে যারা সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে শাপলা চত্বরে এসেছিল, ২০১৭ সালে এসে তারা গণভবনে অতিথির মর্যাদা পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণভবন সরকারপ্রধানের বাসভবন। সেখানে যে কেউ যেতে পারেন। বিএনপি প্রধানকেও ডাকা হয়েছিল, তিনি আসেননি। অতীতের চিন্তাচেতনা থেকে সরে এসে সরকারের উন্নয়নে যদি হেফাজত সামিল হতে চায়, তাহলে সেটা হতেই পারে।’

‘হেফাজত ভুল করেছিল’ এমন কথা মাহাবুবউল আলম হানিফ বললেও হেফাজত কখনোই বলেনি উল্লেখ করেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবীর। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেফাজত কৌশল পাল্টেছে, নীতি পাল্টায়নি। ১৩ দফা থেকে একচুলও সরেনি তারা। উদ্বেগের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ বলছে সমঝোতা হয়নি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হওয়া বৈঠকের মাধ্যমে হেফাজত যে গ্রহণযোগ্যতা আদায় করে নিলো, সেটাকে তারা পুঁজি করবে যখন, তখন সেটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে কিভাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হেফাজতকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ মৌলবাদের আধিপত্য বিস্তারে তাদের যে ইচ্ছা সেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া। এজন্য আওয়ামী লীগকে চড়া মাশুল দিতে হবে। কারণ, হেফাজত সুবিধা আদায়ে তাদের কৌশল পাল্টেছে মাত্র। ভুলে গেলে চলবে না এই হেফাজতের শীর্ষনেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধী, হরকাতুল জেহাদের মতো সংগঠনের সদস্য হিসেবে মৌলবাদী, জিহাদি উন্মাদনা ছড়িয়েছে সমাজে।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম।

x

Check Also

অভিযোগ মিথ্যা, এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি : খালেদা

  প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ব্যবহার করে এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি বলে দাবি করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা ...