৬ লাখ কোটি টাকা পাচার ১০ বছরে

দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বছরে মোট যত টাকা বিনিয়োগ করেন, প্রায় তত টাকাই পাচার হয় বাংলাদেশ থেকে। একসময় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা অর্থ পাচার না করে দেশেই বিনিয়োগের কথা ভাবতেন। শুধু রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ বিদেশে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখতেন। কিন্তু এখন দেশের ভেতরে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার অভাব আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিদেশে অর্থ পাচার করে বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন, কারখানা গড়ছেন। ব্যবসায়ীরা দেদার অর্থ পাচার করছেন আমদানি-রপ্তানির আড়ালে; আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে আর রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়ে। মধ্যম সারির কর্মকর্তা থেকে উচ্চপর্যায়ের আমলা, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও নগদ অর্থ পাচার করছেন হুন্ডি করে, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে, বিদেশে বসে ঘুষের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে। শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে আরো প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০১৩ সালে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এভাবে গত ১০ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থপাচারের দিক থেকে ভঙ্গুর রাজনীতির দেশ পাকিস্তানকেও বহু ধাপ পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ।

ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) গত সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থপাচারের এমন ভয়াবহ তথ্য রয়েছে। কেবল অবৈধভাবে অর্থপাচার নয়, বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশে ঢুকছেও প্রতিবছর। অবৈধ পথে রেমিট্যান্স ঢোকায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তারের উদ্দেশ্যেও বিদেশ থেকে অবৈধ পন্থায় অর্থ আসছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে অবৈধভাবে আসা অর্থের পরিমাণ প্রায় সর্বনিম্ন ৩৩ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জিএফআই প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ অর্থপাচারের দিক থেকে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৬তম। তবে এ বছর দেশগুলোর মধ্যে কোনো র্যাংকিং করেনি সংস্থাটি। তবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল অর্থপাচার হওয়ার এ পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা। অর্থপাচার প্রতিরোধে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তাঁরা বলেছেন, না হলে অর্থপাচারের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেও পাচার থামানো যাবে না।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ওই বছরে সারা দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পেছনে সরকারের ব্যয় হওয়া অর্থের প্রায় সমান। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা। আবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে বাংলাদেশে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। আর যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় তার অনেকাংশই বাস্তবায়ন হয় না। সেই হিসাবে ২০১৪ সালে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা দেশে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ (৭৩ হাজার কোটি টাকা) তার প্রায় কাছাকাছি বলেই ধরা হচ্ছে (এক ডলার সমান ৮০ টাকা ধরে এই হিসাব করা হয়েছে)।

গত সোমবার ‘উন্নয়নশীল দেশের ভেতরে এবং বাইরে অবৈধ অর্থের প্রবাহ : ২০০৫-২০১৪’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জিএফআই বলেছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ যে মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করেছে, তার ৯ থেকে ১৩ শতাংশ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। পাকিস্তানে এ হার ১ শতাংশ, ভারতে ২ থেকে ৩ আর শ্রীলঙ্কায় ৪ থেকে ৭ শতাংশ।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ সাত হাজার ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলার। এর ১৩ শতাংশ অর্থপাচার হয়ে থাকলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬১ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা আমদানি-রপ্তানি পণ্যের দামে হেরফের করে পাচার হয়েছে। বাকি ১১ হাজার ২১২ কোটি টাকা নগদ পাচার হয়েছে। আর সর্বনিম্ন ৯ শতাংশ অর্থপাচার হয়েছে ধরে নিলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। বাকি অর্থ নগদ পাচার হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৪৪ হাজার ৬১৫ কোটি ডলার বা ৩৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৭ শতাংশ অর্থই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ অর্থপাচার হয়েছে ধরে নিলে এই ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখ ছয় হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। তবে সর্বনিম্ন ১২ শতাংশ ধরলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে চার লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছিল, ২০০৪-২০১৩ পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ চার লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার মতো।

২০০৫ থেকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৭ থেকে ১২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে জিএফআই। অর্থাৎ এই ১০ বছরে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে মোট বাণিজ্যের ৭ শতাংশ পাচার হয়ে থাকলে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ৪৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর ১২ শতাংশ হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় চার লাখ ২৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, পাচার হচ্ছে প্রায় তারই সমান। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা তা পাচার না করে দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতো। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ছাড়াও রাজনৈতিক সংকট বড় বাধা। আপাতদৃষ্টিতে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকলেও রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমন অবস্থায় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের নিরাপত্তার স্বার্থে হাত গুটিয়ে রাখে। তা ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগের অনুকূলে নয়। কিছুদিন পরপরই যেভাবে বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটছে, তাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক আছে।

তিনি বলেন, গত ৮-৯ বছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি, আগের মতোই জিডিপির ২২-২৩ শতাংশ পর্যন্তই রয়ে গেছে। আর তথ্য-প্রযুক্তির বিস্তার ও শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটায় এখন খুব সহজেই অর্থপাচার করা সম্ভব হচ্ছে। আর এর বড় অংশই পাচার হচ্ছে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে। ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে বাড়তি অর্থ পাচার করছেন। আবার রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়েও পাচার করছেন।

অর্থপাচার প্রতিরোধে বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, রাজনীতিতে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্কতা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর প্রথম সহসভাপতি ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, টাকা এমন এক জিনিস, মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেও এর পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই পাচার বন্ধের চেষ্টা করার চেয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের দেশের ভেতরে বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত হলে, ব্যবসায়ীরা ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে বিনিয়োগের সুযোগ পেলে কেউই বিদেশে অর্থপাচার করবে না।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জিএফআই বলেছিল, এই ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ চার লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার মতো। ওই ১০ বছরের অর্থপাচারের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেসব বছর দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা বেশি ছিল, সেসব বছরে অর্থপাচার বেড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তার সময় ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে আগের ৯ বছরের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হয়েছে। ওই বছরটিতে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অনেক বেড়ে যায়। বছরটিতে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এর আগের অন্যান্য বছরের মধ্যে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার পাচার হয়েছে।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলার বা এক লাখ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো ২০১৪ সালে যে পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি করেছে, তার শতকরা ৪.২ শতাংশ থেকে ৬.৬ শতাংশ অর্থপাচার হয়েছে। ২০০৫-২০১৪ সময়ে পাচার হওয়া অর্থের মধ্যে গড়ে ৮৭ শতাংশ পাচার হয়েছে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে।

x

Check Also

ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ)হচ্ছে মুসলিম মিল্লাতের ঐক্যের প্রতীক,সূফি মিজান

হোসেন বাবলা:১৯নভেম্বর বন্দর নগরীতে নগর গাউছিয়া কমিটির উদ্যোগে পবিত্র মাহে রবিউল আউয়াল উপলক্ষে স্বাগত জানিয়ে ...