অর্পণ থেকে আব্দুর রহমান এবং ওমানকাহিনী | ওমানে বড় হওয়া অর্পণ দেখে দেখেই ইসলামকে ভালবেসে ফেলে ! ওদিকে ইসলাম গ্রহণ করায় বাবা চলমান জঙ্গি ইস্যু ব্যবহার করে সন্তানকে ফেরাতে চান !…

স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বড় ডাক্তার বানাবো। বাড়ি বন্ধক রেখে বিদেশের মাটিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে লেখাপড়া শিখিয়েছি। যথাসময়ে ও লেভেল পাশ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষরও রেখেছে। কিন্তু এর মধ্যে কখন যে জঙ্গি গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়েছে তা বুঝতে পারিনি। যখন সবকিছু জানলাম তখন ছেলেকে আর ফেরাতে পারিনি। সব স্বপ্ন আমার ধুলোয় মিশে গেলো। আমাদের প্রথম সন্তান। নাম রেখেছিলাম অর্পণ শীল। জঙ্গি গ্রুপে যোগ দেয়ার পর তার নাম হয়ে যায় আবদুর রহমান ওরফে আবদুল্লাহ। অর্পণ চট্টগ্রাম শহরেই আছে। ষোল দিন আগেও ওমানে থাকা তার ছোট ভাইয়ের সাথে মোবাইলে কথা বলেছে।’
ছেলের জঙ্গি গ্রুপে যোগ দেয়ার কাহিনী বলতে বলতে একপর্যায়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ চৌধুরীহাটের বাসিন্দা সুভাষ শীল।
ছেলে বিপথগামী হয়েছে কিংবা ধর্মান্তরিত হয়েছে তাতে কোনো আক্ষেপ নেই সুভাষের। কষ্টের বিষয় হচ্ছে, খাটো হয়ে গেছেন সমাজ ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে। তিনি মনে করেন, একটি সন্তান না হয় মরে গেছে, কিন্তু স্ত্রী ও অন্য দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সমাজে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চান।
ধর্মান্তরিত হয়ে জঙ্গিগ্রুপে যোগ দেয়ার বিষয়টি জানিয়ে গত বছরের জুলাই মাসে হাটহাজারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন মা অনিতা শীল।
ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দুই বছর আগে ধর্মান্তরিত হয়েছে অর্পণ। পরিবারের লোকজনকেও ধর্মান্তরিত হতে প্ররোচিত করতো। ধর্মান্তরিত হবার পর নাম দিয়েছেন আবদুর রহমান। ঘরে থেকে চলে যাবার সময় পরিবারের লোকজনকে জানিয়েছে সে ‘আইএস’-এ যোগ দেবে, ইসলামের জন্য যুদ্ধ করবে সিরিয়া, সৌদিআরব ও দুবাই যাবে।’
অর্পনের বাবা সুভাষ বলেন, বড়ই স্বপ্ন ছিল বড় ছেলেটিকে ডাক্তার বানাবো। তাই ভর্তি করিয়েছিলাম ইংলিশ্ মিডিয়াম স্কুলে। বরাবরই মেধাবী ছিল সে। নিজের পুরো জীবনটা সেলুনে কাজ করেছি। ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালাতে গিয়ে গ্রামের বাড়ির বাড়ি-ভিটে বন্ধক রেখেছি। ওমানে থাকাকালে তার মা টেইলার্সের কাজ করতো। চেয়েছিলাম ছেলেকে যেন আমার মতো সেলুনে কাজ করতে না হয়। কিছুই হলো না আমার। স্বপ্ন আমার স্বপ্নই রয়ে গেলো।
তিনি বলেন, হাটহাজারী বাসস্টেশনে একটি সেলুনের দোকান করতাম। প্রায় ৩০ বছর আগে আমি দুবাই যাই। সেখানেও সেলুনের ব্যবসা শুরু করি। ২০০৩ সালে অর্পণ ও তার মাকে দুবাই নিয়ে যাই। সাত বছর বয়সী অর্পণকে দুবাইয়ের দক্ষিণ বাতিনাহ এলাকায় ইন্ডিয়ান স্কুল ‘মুলাদা’ নামে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিই। ২০১৩ সালে ‘ও’ লেভেল পাশ করা অর্পণ ভালভাবে বাংলাও বলতে পারে না। দশ বছরে তার লেখাপড়ার পেছনে প্রায় ৭০ লাাখ টাকা খরচ হয়েছে। ‘ও’ লেভেল পাশ করার পরপরই দেখা যায় অর্পন দাঁড়ি রাখা শুরু করেছে। ২০১৪ সালের শুরুতে ওমান থেকে তাকে দেশে পাঠিয়ে দিই। এর আরো কয়েকমাস আগে তার মা দেশে চলে আসে।
সুভাষ বলেন, দেশে ফেরার পর অর্পণ সাত আট মাস বাড়িতে ছিল। নগরীর জিইসি, অক্সিজেন, চকবাজার এলাকায় তার যাতায়াত ছিল। ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় তার মায়ের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে নেয়। যাবার সময় মাকে বলে, ‘ইসলামের জন্য যুদ্ধে যেতে হবে। আমার হাত অনেক লম্বা। দেড় বছর আগে একদিন তার মায়ের কাছে ফোন করে ইসলামের পথে আসার আহবানও জানায়। এরপর থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ ছিল। ওমানে থাকা ছোট ভাই অংকন শীলকে ফোন করে অর্পন জানায় সে চট্টগ্রামেই আছে। ইতিমধ্যে বিয়েও করেছে। দুই তিনমাস পর তার স্ত্রী সন্তানের জন্ম দেবে। আমাকেও নাকি মাঝে মাঝে দেখে। তবে আমাদের কাছে আর ফিরবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে তার ছোট ভাই অংকনকে।

ধর্মান্তরিত হওয়ায় হাটহাজারীর সুভাষ শীল সন্তানকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে আইনের ম্যারপ্যাচে ফেলার চেষ্টা করছেন-এমনটি দাবি করেছেন – ওমানে ‘ও’ লেভেল পাশ করা আবদুর রহমান (অর্পণ শীল)। ওমানে ‘ও’ লেভেল পাশ করা অর্পন শীল এখন জঙ্গি আবদুর রহমান শিরোনামে গত বৃহস্পতিবার দৈনিক পূর্বকোণে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ছেলে ‘জঙ্গি’ গ্রুপে যোগ দিতে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে এমনটি দাবি করে সুভাষ হাটহাজারী থানায় একটি সাধারন ডায়েরি করেছেন। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন সুভাষ। গতকাল শনিবার দুপুরে পূর্বকোণ কার্যালয়ে সশরীরে এসে অর্পণ ওরফে আবদু রহমান বলেন, পত্রিকা অফিসে এসে আবার বাবা যা বক্তব্য দিয়েছেন তা মিথ্যে। আমি পবিত্র ইসলাম ধর্ম দিক্ষিত হয়েছি বিধায় মিথ্যে তথ্য দিয়ে আমাকে কখনো ‘আই এস’ কখনো ‘জঙ্গি’ সাজানোর চেষ্টা করছেন। আমি বুঝে শুনে ধর্মান্তরিত হয়েছি।

ইসলামের প্রতি অনুগত হয়ে রাসুলের সুন্নাত পালনের উদ্দেশ্যে দাঁড়ি রেখেছি। এতে কি ‘আইএস’ হয়ে যায়?
অর্পণ বলেন, ২০১৪ সালে ২৮ এপ্রিল ‘সুলতানাত অফ ওমান’ এর মিনিটিষ্ট্র অফ এন্ডোর্সম্যান্ড এন্ড রিলিজিয়ান্স এর মাধ্যমে এফায়ার্স অফ ইফতা অফিসে ইসলাম গ্রহণ করেছি। উক্ত সংস্থা ওমানের সরকারি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত।
ধর্মান্তরিত হবার পর বাবা আমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। পুরনো ধর্মে ফিরে আসতে বললে তাতে রাজি না হলে তিনি আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন।
অর্পনের দাবি- ধর্মান্তরিত হবার পর তার বাবা ওমানেও একই ধরনের অভিযোগ দিয়েছিলেন কিন্তু ওমানের সরকারি অফিস তা গ্রহণ করেনি। উল্টো তার বাবাকে সতর্ক করে বলেছেন, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় যদি অর্পণকে কোন ধরনের মিথ্যে হয়রানি করা হয় বাবা সুভাষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অর্পণ বলেন, তিনি নারায়ণ হাট থেকে বিয়ে করেছেন তার স্ত্রীর নাম তাহরিমা তারান্নুম মীম। তিনি কখনো নিখোঁজ ছিলেন না। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি করেন। বায়েজিদ থানার অক্সিজেন এলাকয় সপরিবারে বসবাস করেন। বাবা ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয় স্বজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
গত বুধবার সন্ধ্যায় হাটহাজারীর সুভাষ শীল দৈনিক পূর্বকোণ কার্যালয়ে এসে দাবি করেন-তার ছেলে অর্পণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘জঙ্গি’ গ্রুপে যোগ দিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। ধর্মান্তরিত হবার পর তার নাম দিয়েছেন আবদুর রহমান আবদুল্লাহ।
গতকাল শনিবার সুভাষ শীলের সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান, আমার সাথে অর্পনের যোগাযোগ বন্ধ তাই আমি ধারণা করেছি সে ‘জঙ্গি’ গ্রুপে যোগ দিয়েছে।

x

Check Also

১৫ ডিসেম্বর ষ্টীলমিলস্ স্কুলের পুনর্মিলনী

দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চিটাগাং স্টীল মিলস হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পুনর্মিলনী আগামী ১৫ই ডিসেম্বর ...