চট্টগ্রাম বার আউলিয়ার শহর, বাদরু-দ-দীন অল্লামহ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হক প্রসঙ্গ

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই

চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার শহর। এই চট্টগ্রাম জুড়ে সেই মহান অলি ও সুফীদের প্রভাব বিদ্যমান। চট্টগ্রামে বার আউলিয়ার অবস্থান সম্পর্কে অনেক ইতিহাস রয়েছে। সুফীবাদের এই চট্টগ্রামে বার আউলিয়ার অন্যতম অলি বলা হয় সুফী দরবেশ বদর শাহকে। কেউ কেউ বদর শাহ কে চট্টগ্রামে প্রথম মুসলমান মিশনারী বলেন। ইতিহাসের মুসলমান অধ্যায়ে সেই বদর আউলিয়াকে নিয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. মুহম্মদ এনামুল হক “বদর শাহ্ বা বাদরু-দ্-দীন ‘অল্লামহ্” শিরোনামে বিশাল ইতিহাস গবেষণা করেছেন। সেই ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রাচীন চট্টগ্রামের ইতিহাস ও গৌরবোজ্জ্বল সোনালি দিনগুলো আমরা ভুলতে বসেছি। ভুলতে বসেছি আমাদের অতীত ইতিহাসকে। চট্টগ্রাম শহরের লালদিঘিস্থ জেলখানার উত্তরপার্শ্বে বদরপাতি এলাকাটি বদর আউলিয়ার স্মৃতি বহন করে। সেই বদরপাতিতে বাদরু-দ-দীন (বদর শাহ) এর প্রাচীন সমাধি আজও দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশি পর্যটক, ইতিহাস গবেষক, লেখক এর সমাগম ঘটে এই প্রাচীন সমাধির সম্মুখে। বর্তমান সময়ে ইতিহাস সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুফীবাদের এই চট্টগ্রাম বিষয়ে জানার প্রয়োজনে আমি প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. মুহম্মদ এনামুল হকের একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ তুলে ধরছি। (প্রবন্ধটিতে বানানরীতি প্রবন্ধকারের নিয়মে অক্ষুণœ রাখা হয়েছে)। চট্টগ্রামের দেশবিখ্যাত সাধক বদরশাহের, চট্টগ্রামের ত নহেই, বাঙালার কোন শিক্ষিত ব্যক্তির নিকট বিশেষ কোন নূতন পরিচয় আবশ্যক করে কিনা বলিতে পারি না। এ বিষয়ে তাঁহার পুণ্য নামই যথেষ্ট; কেননা তাঁহার নাম সর্ববিদিত। শৈশবে যখন নব-জ্ঞান-পিপাষু গগন-বিহারী মন লইয়া পাঠশালায় পড়িতাম, তখন গুরু মহাশয়ের তাড়নায়, “নিু প্রাথমিক পাঠের” (বোধ হয়, তৃতীয় ভাগ) এই কবিতাটিÑ
“সারী গেয়ে দাঁড়ী-নেয়ে বেয়ে যায় তরী;Ñ
‘বদর বদর’ বলে,
দাঁড় ফেলে সবে মিলে,
পিছনে বসেছে মাঝী হাতে হাল ধরি,
সারী গেয়ে দাঁড়ী-নেয়ে বেয়ে যায় তরী।”Ñইত্যাদি।
মুখস্থ করিলেও, “সারীগান-গাওয়া”Ñ দাঁড়ী-মাঝীর দেশ-বিদেশগামী তরণী বাহিয়া আমার মন পল্লী-জননীর শান্ত-øিগ্ধ বুক ছাড়িয়া যে অর্নিশের সন্ধানে ছুটিয়া যাইত, তথায় যেই পুণ্যচেতা প্রাতঃস্মরণীয় বদর শাহের নাম লইয়া মাঝী মাল্লারা নির্ভয়ে অকুল সমুদ্রে পাড়ি দিয়া থাকে, তাঁহার সন্ধান ও সম্যক পরিচয় লাভে আমার মন তৎপর হইত। আজ এতদিন পরে তাঁহার লুপ্ত জীবনীর আলোচনা করিয়া, মনকে আংশিকভাবে প্রবোধ দিয়াছি।
পীরের সর্বজনবিদিত নাম: বদরশাহ চট্টগ্রামে বিভিন্ন নামে পরিচিতি হায়েন; যথা: “বদরশাহ” “বদর পীর” বা “পীর বদর”। জীবিত লোকদের মধ্যে কেহই তাঁহার পূর্ণ ও প্রকৃত নাম অবগত নহে। উপরে আমরা যে নামটি লিখিয়াছি, তাহা আমাদের অনুমানসিদ্ধ। যতই তাঁহার জীবনীর সহিত পরিচিত হইয়া উঠি, ততই, এই নামটির প্রতি আমাদের বিশ্বাস দৃঢ় হইয়া উঠে। চট্টগ্রামের পীর বদরকে যিনি যেই নামেই অভিহিত করুন, জিলার প্রায় সর্বত্রই তিনি “বদর শাহ” নামে পরিচিত।
পীরের প্রভাব: বদরশাহকে চট্টগ্রাম শহরের পীরভক্ত হিন্দু-মুসলমান, “নগর প্রতিপালক পীর” বলিয়া মানিয়া থাকে। তাঁহার প্রতি স্থানীয় ফিরিঙ্গী (পতুর্গীজ-খ্রীষ্টান)দেরও শ্রদ্ধা কম নহে। এখনও চট্টগ্রামের প্রত্যেক হিন্দু ব্যবসায়ী বৎসরের “হাল-খাতার” প্রথম পৃষ্ঠায়, সিন্দুর দ্বারা “পীর বদর ভরসা” কথাটি লিখিয়া পীরের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করিয়া থাকে। মুসলমানেরা তাঁহাকে “ঔলিয়া” বা শ্রেষ্ঠ সাধক বলিয়া উল্লেখ্য করে। চট্টগ্রামের জলে স্থলে সর্বত্রই তাঁহার প্রভাব সমভাবে অনুভূত হইলেও, পূর্ববঙ্গের সর্বত্র জলেশ্বর হিসাবে সম্মান লাভ করিয়া থাকেন। পূর্ববঙ্গের মাঝী-মাল্লারা এখনও “পাঁচপীর বরদ বদর” না বলিয়া নদীতে পাড়ি দেয় না। চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী মাঝীমাল্লারাও তাঁহাকে জলেশ্বর-রূপে সম্মান প্রদর্শন করে। তাহারা বিশ্বাস করে, পীর বদরের নামে মোমের বাতি মানৎ করিয়া, অথবা ভক্তিভরে মুখে তাঁহারা নাম লইয়া জলপথে যাত্রা করিলে, পথে জলসংক্রান্ত বিপদ হইতে রক্ষা পাওয়া যায়। হিন্দু মাঝীরা বলিয়া থাকে:
“আমরা আছি পোলাপাইন,
গাজী আছে নিগাবান,
শিরে গঙ্গা ধরিয়াÑ
পাঁচপীর বদর, বদর।”
আর মুসলমান মাঝী-মাল্লা বলিয়া থাকে: “আল্লা, নবী, পাঁচপীর, বদর, বদর।” চট্টগ্রামে অসংখ্য পীরের “আস্তানা” ও “দরগাহ” থাকিলেও, বদর শাহের ন্যায় এইরূপভাবে সর্বত্র সমানভাবে, অপর্যাপ্ত ভক্তি কেহ লাভ করেন না। তিনি একাধারে জল-স্থল উভয়েই প্রভাব বিস্তার করিয়া রহিয়াছেন।
পীরের দরগাহ: চট্টগ্রামে শহরের বুকের উপর, বকশী বাজারের দক্ষিণ প্রান্তে, এই প্রাতঃস্মরণীয় সাধকের সমাধিটি বর্তমান। কবরের উপরের মন্দিরটি একটি ক্ষুদ্র প্রাচীন পাকা গৃহমাত্র। আশেপাশে আরও যে কয়েকখানা পাকাঘর রহিয়াছে তাহা আধুনিক। তাহাতে লোকজন বাস করিয়া থাকে, কিন্তু সমাধি-মন্দিরে কেহ বাস করে না। দরগাহের গোঁড়া মুসলমান পাণ্ডারা, অমুসলমানকে সমাধি-মন্দিরটিতে প্রবেশ করিতে দেয় না। তাহারা বাহির হইতেই সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা-নিবেদন করিয়া, অথবা তাঁহার নামে “শিরণী” দিয়া চলিয়া যান। যে উদারচেতা মুসলমান সাধকের নিকট কোন জাতি-ধর্ম বিচার ছিল না, আজ, দুর্ভাগ্যবশত নানা কারণে দুর্দিন আসিয়া পড়ায় হিন্দু-মুসলমানের গোঁড়ামীর মাত্রা প্রবল হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সম্পূজিত পীরদের পবিত্র “আস্তানায়”ও ভেদবিচার প্রবেশ করিয়া তাহাকে কলুষিত করিয়া দিতেছেÑইহাই লক্ষ করিবার বিষয়।
পীর সম্বন্ধে লৌকিক প্রবাদ: কথিত আছে, প্রায় পাঁচ ছয় শত বৎসর পূর্বে, বদরশাহ, চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটির অন্তর্গত কাতালগঞ্জের “কাতালপীর” ও আনোয়ারা থানার অন্তর্গত ঝিয়রী গ্রামের (অধুনা বটতলী গ্রামের) শাহ মুহসিন ঔলিয়া সমভিব্যাহারে একখণ্ড প্রকাণ্ড প্রস্তরের উপর উপবেশন করিয়া ভাসিতে ভাসিতে জলপথে চট্টগ্রাম আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। তখনও চট্টগ্রাম আবাদ হয় নাই, কোন জন-মানবের পাদস্পর্শে চট্টলভূমি ধন্য হয় নাই। তখনও নাকি ইহার সর্বত্র ভূত, প্রেত, দেও (দৈত্য), পরী বাস করিত। কাতালপীর ও বদর সাহেব চট্টগ্রাম পৌঁছিয়াই, প্রস্তরখণ্ড পরিত্যাগ পূর্বক তীরে অবতরণ করিলেন; মুহসিন ঔলিয়া পরিত্যক্ত প্রস্তর খণ্ডে উপবেশন করিয়া জলপথে ঝিয়রীগ্রামে রওয়ানা হইলেন। বদর শাহ তীরে অবতরণ করিয়াই “জিন” (চট্টগ্রামবাসী “জিন” অর্থে ভূত, প্রেত বুঝায়)দের বিষয় অবগত হইলেন। জিনেরা অচিরেই পীরসাহেবকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। কিন্তু সাধকের সনির্বন্ধ অনুরোধ, তাহারা পরিশেষে পীরকে মাত্র একটি “চাটির” (চট্টগ্রামে “চাটি” অর্থ প্রদীপ) স্থান ছাড়িয়া দিতে স্বীকৃত হইল। পীর তাহাতে সম্মতি জানাইলেন। বর্তমান রহমতগঞ্জের অন্তর্গত “কদম মোবারক” নামক প্রাচীন নববী আমলের মসজিদের উত্তর পার্শ্বস্থ ক্ষুদ্র পাহাড়টির চূড়ায় দরবেশের “চাটি” প্রজ্জ্বলনের স্থান নির্দিষ্ট করা হইল। সন্ধ্যা-সমাগমে সাধক পাহাড়ের চূড়ায় “চাটি” জ্বালাইলেন। প্রদীপালোক চতুর্দিকে শতধারে বিকীর্ণ হইয়া পড়িল। পীরের “চাটি” যে অত্যাশ্চর্য্য ঐন্দ্রজালিক প্রদীপ, তাহা জিনেরা জানিত না। যেই প্রদীপালোক চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল, অমনি জিনগুলি ইন্দ্রাজালবশে বাধ্য হইয়া আলোকদীপ্ত স্থান পরিত্যাগ করিতে লাগিল। এই সুযোগ দরবেশ অনতিবিলম্বে আপন আপন অধিকার সীমা বাড়াইয়া লইতে লাগিলেন। এইরূপে ঐন্দ্রজালিক প্রদীপ সাহায্যে সাধক ধীরে ধীরে সমগ্র চট্টগ্রাম হইতে জিনদিগকে বিতাড়িত করিয়া দিয়া, স্থানটিকে মনুষ্য বাসোপযোগী করিয়া তুলিয়াছিলেন। পরে, তিনি বকশী বাজারের দক্ষিণপ্রান্তে “আস্তানা” গড়িয়াছিলেন এবং দেশবাসীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষাদান করিয়াছিলেন।
চট্টগ্রামের কতিপয় স্থানের সহিত বদরপীরের সম্বন্ধ: সে যাহা হউক, চট্টগ্রাম বদরশাহের “চাটির” দ্বারা সর্বপ্রথম আবাদ হয় বলিয়াই নাকি, সমগ্র জিলাটি “চাটিগাঁ”, পরে “চাটগাঁ” এবং আরও পরে সংস্কৃত ভাবাপন্ন হইয়া “চট্টগ্রাম” নাম ধারণ করিয়াছে। বাস্তবিকই, অদ্যাপি অশিক্ষিত চট্টলবাসী, জিলাটিকে “চাটিগাঁ” বা “চাটগাঁ” বলিয়া উল্লেখ করে। যেই পাহাড়টিতে বদরশাহ সর্বপ্রথম “চাটি” বা প্রদীপ জ্বালাইয়াছিলেন বলিয়া প্রকাশ, তাহাকে এখনও লোকে “বদর পাতি” (“পাতি” শব্দটি কি হিন্দি “বত্তি”, বাংলা “বাতি” শব্দের চট্টগ্রামী অপভ্রংশ?) বা বদরশাহের বাতি জ্বালাইবার স্থান বলিয়া উল্লেখ করিয়া থাকে; এবং সাধকের প্রদীপ-প্রজ্বালন ক্রিয়ার স্মরণার্থে, প্রতি সন্ধায়, স্থানীয় পীরভক্ত হিন্দু-মুসলশান ও খ্রীষ্টানগণ ঐ পাহাড়টিতে মোমের বাতি জ্বালাইয়া থাকে। চট্টগ্রাম প্রাচীনকালে ‘জিনদের” দ্বার অধ্যুষিত ছিল বলিয়া প্রমাণ করিতে গিয়া লোকে “পরীর পাহাড়ের” কথা উল্লেখ করিয়া থাকে। এই পাহাড়ের উপরিভাগে বর্তমানে সরকারি বিচারালয়গুলি প্রতিষ্ঠিত; তাই সাধারণত লোকে ইহাকে “কাছারীর পাহাড়ও” বলিয়া থাকে। এই পাহাড়েই নাকি পরীদের প্রধান আড্ডা ছিল; তাই এখনও “পরীর পাহাড়” বা ঋধরৎু ঐরষষ নামে পরিচিত হইয়া আসিতেছে।
এই যে চট্টগ্রামের হিন্দু-মুসলমান-খ্রীষ্টানের নমস্য পীর বদর, তাঁহার জীবনের প্রকৃত তথ্য অবগত হইবার ইচ্ছা কাহার না হইয়া থাকে? উপরে আমরা যে লৌকিক বিবরণ প্রদান করিলাম, তাহা পাঠ করিয়া অনুসন্ধিৎসুমনা ব্যক্তির আকাক্সক্ষা তৃপ্ত হইবে না। তাই নিুে আমরা এই বিষয় সামান্যভাবে আলোচনা না করিয়া থাকিতে পারিলাম না। এই আলোচনা হইয়া কতকটা অনুমানের সাহায্য লওয়া হইয়াছে। এক্ষেত্রে তাহা না করিয়া উপায় নাই; সুতরাং সর্বত্র সমানভাবে সাফল্যলাভ করিয়াছি বলিয়া আশা করিতে পারি না।
বদরশাহের জীবনকাল নিরূপণে নানা পণ্ডিতের সিদ্ধান্ত: যে যাহা হউক, বদরশাহ সম্বন্ধে এ যাবৎ যত গবেষণা চলিয়াছে তাহার ফল জানিয়া লইয়া, আমাদের বর্তমান অনুসন্ধান আরম্ভ হউক। বদরশাহের প্রতি পূর্ববঙ্গের মাঝী-মাল্লার ভক্তি দেখিয়া, বাঙ্গালার আদম-শুমারীর অধ্যক্ষ ই.এ. গেট সাহেব, তাঁহাকে মুসলমানের পৌরাণিক দেবতাস্থানীয় “খাজা খিজিরের” সঙ্গে তুলনা করিয়াছিলেন ডক্টর ওয়াইজ তাঁহাকে বিহারী দরবেশ বদরু-দ-দীন বদর ই-আলম বলিয়া মনে করিয়াছেন মৌলবী হিদায়িত হুসয়ন “ইসলামের বিশ্বকোষে” বদরপীর সম্বন্ধে লিখিতে গিয়া, ওয়াইজ সাহেবের কথায় প্রতারিত হইয়া, বদরশাহকে বিহারী পীর বলিয়া জোরে মত প্রকাশ করিয়াছেন। বিহারীপীর বদরু-দ-দীন কিছুদিন চট্টগ্রামে বাস করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। তিনি ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে (৮৪৪ হিজরী) পরলোকগমন করিয়াছিলেন। তাহা হইলে এই পণ্ডিতদের মতে (অবশ্য গেট সাহেবের উদ্ভট কল্পনার কথা ছাড়িয়া দিয়া) চট্টগ্রাম পীর বদর, পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগের লোক হইয়া পড়ে। সত্যই কি চট্টগ্রামের পীর বদর ও বিহারী পীর বদরু-দ-দীন অভিন্ন? সত্যই কি চট্টগ্রামের পীর বদর পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাবে অর্থাৎ ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন? নানা কারণে পণ্ডিতদের এই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করিতে পারিতেছি না। যে সকল কারণে পণ্ডিতদের সহিত আমাদের মতানৈক্য ঘটিতেছে, তাহা একে একে নিুে বিবৃত হইতেছে।
আমাদের মতানৈক্যের কারণ: প্রথমত: উপরে আমরা পীর সম্পর্কিত যে প্রবাদটি বিবৃত করিয়াছি, তাহাকে কোন সত্য নিহিত নাই বলিয়া, কেবল অনুমান বলে উড়াইয়া দেওয়া সমীচীন নহে। সাধারণভাবে পীরের “কেরামতী” বা অলৌকিক শক্তিমত্তা ফলাইতে গিয়া, তাহার সহিত যে সকল সরল-বিশ্বাস-প্রসূত গল্প জুড়িয়া বসিয়াছে, তাহার কথা ছাড়িয়া দিয়া, এই প্রবাদটি যে একটি বহু প্রচলিত প্রবাদ এবং যুগযুগান্ত ধরিয়া লোক পরম্পরায় চলিয়া আসিয়াছে তাহাতে সন্দেহ করিবার কারণ নাই। এহেন বহু-প্রচলিত ও প্রাচীন প্রবাদে ঐতিহাসিক সত্য নিহিত থাকা কিছুই বিচিত্র নহে। প্রবাদটিতে সাধারণভাবে প্রাচীনত্বের দিকে যে ইঙ্গিত রহিয়াছে তাহা প্রাক-মুসলমান যুগের বলিয়া অনুমান করা, ললাম কল্পনাকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া বই আর কিছুই নহে। বদরশাহ কর্তৃক জিন ও পরী বিতারণের কথায়, এবং চট্টলবাসীকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিবার ইঙ্গিতে, মুসলমান রাজত্বের প্রাথমিক যুগের ধর্মপ্রচারক মুসলমান দরবেশদের কথা মনে হয়। খাজা মুঈনু-দ-দীন চিশতীর (মৃ: ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে) ভারতাগমনে অজমেরাধিপতি পৃথ্বীরাজের পতন হইয়াছিল (১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিরৌরীর সমরক্ষেত্রে); জলালু-দ-দীন তবরেজীর (মৃ: ১২২৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাগমনে রাজা লক্ষ্মণসেনের পতন হইয়াছিল; শাহজলালের (মৃ: ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে) আগমনে শ্রীহট্টাধিপতি রাজা গৌরগোবিন্দের পতন ঘটে। এই হিসাবে মনে হয়, বদরশাহের চট্টগ্রাম আগমনে, চট্টগ্রাম হইতে মগ রাজত্বের অবসান ঘটে। নাসিরাবাদে আবিষ্কৃত, ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দে (১১৬৫ শকাব্দ) লিখিত তাম্রশাসন হইতে জানিতে পারা যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে (তখনও মুসলমানেরা পূর্ববঙ্গ জয় করেন নাই) চট্টগ্রাম ত্রিপুরার হিন্দুরাজাদের অধীন ছিল। ইহার পরে চট্টগ্রাম যে মগদের অধিকারে চলিয়া যায়, তাহার প্রমাণ আছে। এমন কি ত্রিপুরেশ্বরদের আধিপত্যকালেও চট্টগ্রাম মগদের অত্যাচার হইতে মুক্ত ছিল না। পাঠান রাজত্ব হইতে আরম্ভ করিয়া মোগল রাজত্বের প্রায় একশত বৎসর পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরকানী মগ ও ফিরিঙ্গী জলদস্যুদের অত্যাচারের হাত হইতে অব্যাহতি লাভ করে নাই। যতদূর বুঝিতে পারা যায়, কর্ণফুলী নদীর তীরদেশে অবস্থিত “পরীর পাহাড়ে” আরকানী জলদস্যুদের আড্ডা ছিল, এবং বদরশাহের জিন ও পরী বিতাড়ন মগ বিতাড়ন বই আর কিছুই নহে। চট্টগ্রামে জিন ও পরী অর্থে মগদিগকে বুঝায় বলিয়া মনে হয়; কেননা চট্টগ্রামের বালক-বালিকারা এখনও তাহাদের ঠাকুরদাদী, খুড়ী মা, ও জিনগুলি ছেলেমেয়েকে চুরি করিয়া নিয়া বিবাহ করিতেছে, ঘরকন্না পাতিতেছে, কিংবা ভৃত্যের মত কাজ করাইয়া লইতেছে। কিছুদিন পর তাহারা আবার লোকালয়ে ফিরিয়া আসিতেছে ও সংসার করিতেছে। চট্টগ্রাম ও পূর্ববঙ্গের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী সমুদ্রোপকূলস্থিত স্থানগুলিতে আরাকান মগদের অমানুষিক মানুষ চুরির অভিনয় অনেকবার হইয়াছে। আমাদের মনে হয়, চট্টগ্রামের রূপকথাগুলি, আরাকানী মগদিগকেই কেন্দ্র করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিল। সুতরাং চট্টগ্রাম হইতে জিন বিতাড়ণের কথায়, বদরপীর দ্বারা মগদের নিকট হইতে চট্টল বিজয়ের কাহিনী স্মৃতিপথে জাগিয়া উঠে।
দ্বিতীয়ত: সপ্তদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বিরচিত (১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে) “মুক্তল হোছন” বা হুসয়ন-বধ কাব্যে মুসলমানগণ কর্তৃক সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম বিজয়ের যে কাহিনী লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাহাকে কদল খাঁ ঘাযী নামক কোন যোদ্ধৃপুরুষ ও বদর আলাম নামক কোন সাধু পুরুষের নাম পাওয়া যায়। এই পুঁথীর প্রদত্ত বিবরণ হইতে আমাদের উপর্যুক্ত অনুমান সত্য বলিয়া প্রতীমান হয়। তাই নিুে এই দীর্ঘ বিবরণের কয়েকটি কথা উদ্ধৃত করিতেছি:
“কায়মনে প্রণাম করি বারে বার।
কদল খান গাজী জান ভুবনের সার ॥
যার রণে পড়িল অসংখ্য রিপুগণ।
ভয়ে কেহ মজিলেক সমুদ্র গহন ॥
এক পরে হইল সমস্র প্রাণহীন।
রিপু জিনি চাটিগ্রাম কৈলা নিজাধিন ॥
বৃক্ষতলে বসিলেক কাফিরের (মগ (?) গণ।
সে বৃক্ষ ছেদি সবে করিল নিধন ॥
***
তান এক মিত্রে বধিলেক চাটশ্বরী।
মুসলমান কৈল সব চাটিগ্রাম পুরী ॥
কদল খান ঘাযী কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজিত হইবার পর, হাজী খলীল ও মাহী আসোয়ার নামক দুইজন দরবেশ (?) চট্টগ্রাম আগমন করেন। তাঁহারা চট্টগ্রাম পৌঁছিলে,
“একাদশ মিত্র সঙ্গে, কদল খান গাজী রঙ্গে
দুই মিত্রে বাড়ী লই গেলা।
হাজি খলীলকে দেখি, বদর আলাম সুখী
অন্য অন্যে আশ্বেসিলা ॥”
মাহী আসোয়ার, চট্টগ্রামের হাটহাজারী প্রাচীন মসজিদ নির্মাতা ইতিহাসপ্রসিদ্ধ রাস্তি খানের প্রপিতামহ ছিলেন। রাস্তিখাঁ ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে হাটহাজারী প্রাচীন মসজিদ নির্মাণ করেন। মাহী আসোয়ার ও হাজী খালীলের সহিত বদর আলামের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। এই বদর আলাম কি আমাদের আলোচ্য বদর শাহ নহেন? “আরাম” আরবি “অল্লামহ” শব্দের অপভ্রংশ। ইহার অর্থ “মহাজ্ঞান” বা “মহাশিক্ষিত” ব্যক্তি। ইহা মুসলমান সাধুপ্রকৃতির শিক্ষিত ধর্ম প্রচারের উপাধি মাত্র। কদল খান কর্তৃক চট্টগ্রাম-বিজয়ের কিছুকাল পূর্বে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বদরশাহের চট্টগ্রাম আগমন ও পরে উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটা কি অসম্ভব?
তৃতীয়ত: উপর্যুক্ত প্রবাদটি হইতে আমরা জানিতে পারিতেছি যে, শাহ মুহসিন ঔলিয়া ও কাতাল পীর একসঙ্গে চট্টগ্রাম আগমন করিয়াছিলেন। কাতাল পীরের প্রকৃত নাম কি জানা যায়, বোধ হয়, ইহা তাঁহার উপাধি মাত্র। “কাতাল” আরবী “ক্বততাল” যা মহাযোদ্ধা বা সমর সিংহ শব্দের অপভ্রংশ হওয়া বিচিত্র নয়। বোধ হয়, বদর পীর মহাযোদ্ধা কাতালপীরকে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছিলেন সম্ভবত বদরপীরের আদেশে কাতাল পীর, যুদ্ধ করিয়া চট্টগ্রাম হইতে মগ বিতাড়িত করিয়াছিলেন। মুহসিন ঔলিয়ার মৃত্যু তারিখ সম্প্রতি আমরা আবিষ্কার করিয়াছি। তিনি যে প্রস্তরে করিয়া ভাসিতে ভাসিতে ঝিয়রী গ্রামে গিয়াছিলেন বলিয়া প্রবাদে পাওয়া যায়, সেই প্রস্তর খণ্ডটি এখনও তাঁহার দরগাহে রক্ষিত আছে, বলিয়া জানিতে পারিয়া, পুজ্যপাদ আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সাহেবকে সঙ্গে লইয়া, আমরা সেই প্রস্তর খণ্ডটি পরীক্ষা করিতে যাইয়া দেখিতে পাই, তাহা একটি ফারসী তোঘরা অক্ষরে লিখিত প্রকাণ্ড শিলালিপি। আমরা তাহার ছাপ লইয়া আসিয়া দেখিতেছি তাহাতে তিন পংক্তি লিখা আছে। প্রস্তরটি স্থানে স্থানে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় সমস্ত অংশ পাঠোদ্ধার হয় নাই। প্রথম পংক্তিতে আছে:
বতারীখ-ই-বিসতম মাহ-ই-শওয়াল অল মজজূব মুহসিনÑ
(দ্বিতীয় পংক্তি দুষ্পাঠ্য)
তৃতীয় পংক্তিতে শুধু ৮০০ পড়া যায়।
প্রথম পংক্তির বঙ্গানুবাদ, “শওয়াল মাসের বিংশ তারিখে উম্মাদ প্রকৃতির সাধক মুহসিন” সুতরাং শেষ পংক্তির ৮০০ সংখ্যাটি যে হিজরী জ্ঞাপক মৃত্যুর তারিখ তাহাতে আর সন্দেহ নাই। অতএব দেখা যাইতেছে ৮০০ হিজরী অর্থাৎ ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে মুহসিন ঔলিয়া মারা যান। বদরশাহ যদি তাঁহার সমসাময়িক হয়েন, নিশ্চয় তিনি চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন।
উপর্যুক্ত আলোচনা হইতে সংক্ষেপে আমরা নিুলিখিত তিনটি বিষয় জানিতে পারিতেছি, যথা:
(১) বদরশাহ চট্টগ্রাম মুসলমান কর্তৃক বিজিত হইবার সামান্য পূর্বে এ জেলায় আগমন করেন। তাঁহার সহিত মগদের যুদ্ধ হয় এবং তিনি তাহাদিগকে যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া চট্টগ্রামের কতকাংশ জয় করেন।
(২) তাঁহার চট্টগ্রাম অবস্থানকালে কদলখান ঘাযী কর্তৃক চট্টগ্রাম পূর্ণরূপে বিজিত হয়। তিনি রাস্তিখানের প্রপিতামহ মাহী আসোয়ারের সমসাময়িক।
(৩) বাদরশাহ মুহসিন ঔলিয়ার সমসাময়িক; সুতরাং তিনি চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে জীবিত ছিলেন; কেননা মুহসিন ঔলিয়া ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েন।
বিভিন্নমুখী এই ত্রিবিধ আলোচনা হইতে বদরশাহের সময়-নির্ধারণ অতি সহজ। মুহসিন ঔলিয়ার সময় জানা গিয়াছে; সুতরাং অপর দুইটি বিষয়ে সময় নির্ধারিত হইলে এবং তাহার সহিত মুহসিন ঔলিয়ার প্রাপ্ত তারিখের বিরোধ উপস্থিত না হইলে, একরূপ সঠিকভাবেই বদরশাহের সময় জানিতে পারা যাইবে। অতএব মুসলমান কর্তৃক সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম বিজয়ের তারিখ ও মাহী আসোয়ারের তারিখ জানিতে পারিলে আমাদের বর্তমান উদ্দেশ্য সফল হইতে পারে।
বদরশাহ ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে জীবিত ছিলেন: শিহাবু-দ-দীন তালীশ নাম জনৈক সপ্তদশ শতাব্দীর ফারসী ঐতিহাসিকের বিবরণ হইতে জানিতে পারা যায়, ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগটি সুবর্ণ গ্রামের সর্বপ্রথম স্বাধীন সুরতান ফখরু-দ-দীন মুবারক শাহ (১৩৩৬-১৩৫২) কর্তৃক বিজিত হইয়াছিল। ইহাই চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মুসলমান বিজয়। ফখরু-দ-দীন চট্টগ্রাম জয় করিয়া চাঁদপুর হইতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি রাজবর্ত্ম প্রস্তুত ও অনেক মসজিদ ও কবর নির্মাণ করাইয়াছিলেন। ১৩৪৬-৪৭ খ্রিস্টাব্দের শীত ঋতুতে মিসর দেশীয় পর্যটক ইবন-বতুতা চট্টগ্রামের আসিয়া পৌঁছিয়াছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছিয়া দেশটিকে ফখরু-দ-দীনের শাসনাধীনে দেখিয়াছিলেন। সুতরাং ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মুসলমানগণ কর্তৃক বিজিত হইবার যে বিবরণ শিহাবু-দ-দীন তালীশের ইতিহাস হইতে পাওয়া যাইতেছে, তাহা যে সত্য তাহাতে সন্দেহ নাই। আমাদের মনে হয়, এই বিজয় ব্যাপারে কদল খান ঘাযী সেনাপতি ছিলেন। কোন নিয়মিত ইতিহাস হইতে ফখরু-দ-দীনের চট্টল-বিজয়ী সেনাপতির নাম পাওয়া না গেলেও কদল খান ঘাযীকে তাঁহারা সেনাপতি ছিলেন বলিয়া মনে করিতে বাধার কোনো বিশেষ কারণ দেখিতে পাই না; কেননা সপ্তদশ শিহাবু-দ-দীন তালীশ হইতে, ঐ শতাব্দীর মুহম্মদ খানকে (যিনি কদল খান ঘাযীর বিবরণ বাঙ্গালায় লিখিয়াছেন) কোন অজুহাতে অপ্রমাণিক বলিয়া বলিতে পারা যায়। তাহা হইলে, ন্যুনাধিক ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে, কদল খান ঘাযী, মাহী আসোয়ার ও বদর শাহ জীবিত ছিলেন। পূর্বেই বলিয়াছি মাহী আসোয়ার রাস্তি খানের প্রপিতামহ; রাস্তিখান ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে হাটহাজারীর মসজিদ নির্মাণ করিয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহারা প্রপিতামহ মাহী আসোয়ার ন্যুনাধক একশত বৎসর পূর্বে জীবিত ছিলেন। অতএব মাহী আসোয়ার ও কদল খান ঘাযীর সমসাময়িকতায় কোন বাধা থাকে না। এখন কতকটা স্থির নিশ্চিত হইয়া বলিতে পারি, বদরশাহ ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে জীবিত ছিলেন। মুহসিন ঔলিয়ার মৃত্যু তারিখ ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে; সুতরাং তাঁহার সহিত বদরশাহের চট্টগ্রাম আগমনের প্রবাদ ভিত্তিহীন নহে।
বদরশাহ কখন দেহত্যাগ করেন, তাহা জানিতে না পারিলেও, অন্ততঃ ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি যে জীবিত ছিলেন, তাহা একরূপ নিশ্চিতভাবে জানা যাইতেছে। সুতরাং বদর পীর কখনও বিহারী পীর হইতে পারেন না। যে লোকটি ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে অন্ততঃ পৌঢ় বয়স্ক, আর যে লোকটির সমভিব্যহারী বন্ধু ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে মারা যায়েন, তিনি কখনও ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলিয়া মনেও করা যাইতে পারে না।
শিহাবু-দ-দীন তালীশের ইতিহাস হইতে জানিতে পারা যায়, পীর বদরের দরগাহে মগগণ কয়েকটি গ্রাম দান করিয়াছিল এবং তাহারা দরগাহে নানা উপঢৌকন উপহার দিত। এখনও দরগাহের কোন সম্পত্তি আছে কিনা জানিতে পারি নাই। প্রতি বৎসর ২৯শে রমজান এই পীরে “উরস” অর্থাৎ বার্ষিক-স্মৃতি-উৎসব সম্পন্ন হয়। পূর্বে এই উৎসব অতি জাঁকজমকের সহিত সম্পন্ন হইত বলিয়া মনে হয়। এই সময়, অসংখ্য গরু জবাই করা হইত ও তৎ-মাংসে উপস্থিত ব্যক্তিগণকে খাওয়াত হইত। ইহাকে “বদরের শিরণী” বলা হইত। “বদরের শিরণ” যে একটি প্রসিদ্ধ ব্যাপার ছিল, তাহা এখনও চট্টগ্রামের নিুলিখিত প্রবাদবাক্যে রক্ষিত হইয়াছে:
“বিলব গরু, বদরের ছিন্নিÑ
কেঅয় পাইল ঘরা ঘরা, কেঅয়, পাইল ইক্কিনী ॥”
অর্থাৎ মাঠের গরুর পারের ন্যায় গরু দিয়া বদরের শিরণী প্রস্তুত করা হয়; কিন্তু তাহা সকলের লুট করিয়া খায় বলিয়া, কেহ সামান্য লাভ করে আর কেহ অত্যাধিক লাভ করে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

x

Check Also

সার্ক চেম্বার সভায় যোগ দিতে চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম’র ভুটান যাত্রা

দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি’র সভাপতি মাহবুবুল আলম ২২ জুলাই সকাল ৯.২০ টায় ...