রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ আজ | বিদায় আলোচিত-সমালোচিত রকিব কমিশন

বুধবার মেয়াদ শেষ হচ্ছে কাজী রকিবউদ্দীন নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের। রাষ্ট্রপতির নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করা এ কমিশন মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করে তাদের মেয়াদের কার্যক্রম তুলে ধরবে। পর দিন বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের পাঁচ বছরের মেয়াদের কার্যক্রম তুলে ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেবে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এই ইসি।
সমালোচনার ঝড়টা শুরু হয় বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই সম্পন্ন করা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। এ কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্মরণকালের ভয়াবহ তাণ্ডব চলে। ভোটার থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হতাহত হন। দেশে বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগের মতো নৃশংস তাণ্ডব শুরু হয়। এরপর প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে হওয়া স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের বিধি সংশোধনে কোনো রাজনৈতিক দলের মতামত না নেয়া এবং ছয় ধাপের ভোটে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাইসহ নানা অনিয়ম এবং নির্বাচনী সহিংসতায় শতাধিক প্রাণহানির ঘটনায় ব্যর্থতার ঘøানি বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাদের। তবে বছর শেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন শতভাগ শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করে পেছনের সমালোচনা অনেকটাই আড়াল করে প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদায় নেয়ার আগে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের নিয়ম রয়েছে। এরই মধ্যে রোববার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎপর্ব শেষ হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেদের মেয়াদের কার্যক্রম তুলে ধরবেন তারা। পরদিন প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে কার্যক্রমগুলো তুলে ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেবে ইসি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিজেদের সফল কার্যক্রমগুলোর একটি তালিকা এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে রকিব কমিশন দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়লেও সব নির্বাচন সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর ভোটাধিকার প্রয়োগ, ইভিএম তৈরির উদ্যোগ এবং স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রমের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে এতে। ইসি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতির কাছে যেসব বিষয় তুলে ধরা হতে পারে তার একটি ধারণা দেয়া হলো-
দশম জাতীয় নির্বাচন: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪ বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্জন করলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ ভোটারের সবাই ভোট দিতে পারেনি। তবে অন্য আসনগুলোতে ভোটের চিত্র ভালো ছিল। এসব আসনে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৯০ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: দেশে ৪ হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে ১৮টি দল অংশ নিলেও মূল লড়াই হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত এ ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকে শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ পর্যন্ত সহিংসতায় নিহত হয় শতাধিক ব্যক্তি। আহত হয় কয়েক হাজার। যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। ইউপি নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৮৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সব চেয়ে খারাপ বলে আখ্যায়িত করা হতো। ওই নির্বাচনে মারা গিয়েছিলেন ৮০ জন ও আহত হয়েছিলেন পাঁচ হাজারের বেশি। সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই নির্বাচন নিহতের পাশাপাশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় (২২০ জন) নির্বাচিত হওয়ারও রেকর্ড গড়েছে। এর আগে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য এসব বিষয় তুলে না ধরে সফলভাবে নির্বাচন শেষ করার বিষয়টিই রাষ্ট্রপতিকে জানাবে ইসি।
দলীয় প্রতীকে প্রথম সিটি নির্বাচনের ভোট: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো দলভিত্তিক সিটি নির্বাচনের যাত্রা শুরু করে ইসি। সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হওয়া এই নির্বাচনের মাধ্যমেই কমিশন প্রথমবারের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা পায়। এ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ইসির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এটিকে ইসির বড় সফলতা হিসেবে তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন: বিএনপি-জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছাড়াই ২৮ ডিসেম্বর তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করে ইসি। এ নির্বাচনে জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার ও জেলা নির্বাচন অফিসাররা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কোথাও কোথাও উপজেলা নির্বাচন অফিসারকেও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়। প্রতিটি জেলায় স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের (স্থানীয় সরকারের চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ হাজারের ওপরে ভোটার) ভোটেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচিত হয়। প্রতিটি জেলায় চেয়ারম্যান ছাড়াও ১৫ জন সাধারণ ও ৫ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন।
আম ও মশাল প্রতীক নিয়ে দ্বন্দ্বের অবসান: ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) আম প্রতীকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হয়। নিবন্ধনকালে দলটির চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ শওকত হোসেন নিলু ও মহাসচিব ছিলেন অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। ২০১৪ সালের ১৬ আগস্ট চেয়ারম্যান নিলু বহিষ্কার করেন মহাসচিব ফরহাদকে। পরে ১৮ জুলাই চেয়ারম্যান নিলু নতুন কমিটি গঠন করে ওই বছরের ২২ অক্টোবর জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে অনুমোদন করে ইসিতে তালিকা পাঠান। অন্যদিকে গত বছরের ১৪ অক্টোবর তৎকালীন মহাসচিব ফরহাদ নিজেকে চেয়ারম্যান ও  মো. মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাকে মহাসচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। এ সময় শওকত হোসেন নিলুকে বহিষ্কার সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ নতুন কমিটি ইসিতে তালিকা পাঠায়। সেই সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৯ জুলাই এনপিপির এ অংশের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কার্যকরী কমিটির সভার কার্যবিবরণী যুক্ত করে দলীয় প্রতীক ‘আম’ দাবি করেন ফরহাদ। দুই দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির করে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নির্বাচনী প্রতীক আম শেখ শওকত হোসেন নিলুর পক্ষকে দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন।
এদিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মশাল প্রতীকের  পক্ষে দলটির দুই পক্ষ কমিশনের দারস্থ হয়। ১২ মার্চ সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে শিরীন আখতারকে সাধারণ সম্পাদক করা নিয়ে দুই ভাগ হয় জাসদ। হাসানুল হক ইনু ও শিরীনের কমিটির পাশাপাশি পাল্টা কমিটি গঠন করেন মইনুদ্দিন খান বাদল, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধান এবং তাদের অনুসারীরা। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ১৩ এপ্রিল ইনু-শিরীন নেতৃত্বাধীন জাসদকে মূলধারা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২৮ এপ্রিল তাদের মশাল প্রতীক দেয় নির্বাচন কমিশন।
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর ভোটাধিকার প্রয়োগ: ২০১৬ সালের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ছয় দশক পর বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের   ভোটাধিকার প্রয়োগ। ৩১ অক্টোবর ২২টি ছিটমহলবাসী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। গত বছর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নানা বঞ্চনার অবসান হয় ছিটবাসীদের। বাংলাদেশের ৫১টির বিনিময়ে ভূখণ্ডের মধ্যে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা পায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। এর আগে ১০ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ অংশে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকার কাজ শুরু হয়। ১৭ থেকে ২৫ জুলাই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের ছবি  তোলা, ১ আগস্ট ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের খসড়া ও ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ বছর সেখানে সাড়ে ১০ হাজারের মতো ছিটবাসী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
ইভিএম তৈরির উদ্যোগ: নিজস্ব উদ্যোগে নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) তৈরির উদ্যোগ নেয় কাজী রকিব কমিশন। ইসির প্রস্তাবিত নতুন ইভিএমের কারিগরি ও ব্যবহারিক দিক, নির্বাচনে ব্যবহারের উপযোগিতা, সুবিধা-অসুবিধা ইত্যাদি পর্যালোচনার জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। টেকনিক্যাল কমিটিতে একজন উপদেষ্টা, একজন আহ্বায়ক, একজনকে সদস্য সচিব করে বাকিদের সদস্য করা হয়েছে। এর আগে বুয়েটের সহযোগিতায় ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে আংশিক ভোটের মাধ্যমে ইভিএম চালু হয়। পাঁচ বছরের মাথায় সেগুলোর কয়েকটি বিকল হয়ে পড়ে। ইভিএমে দেশীয় ব্যাটারি ব্যবহার নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে দ্বন্দ্ব শুরু হয় বুয়েটের সঙ্গে। বুয়েট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ওই ব্যাটারি ব্যবহারের কারণেই ইভিএমগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না।
স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম: নাগরিকদের হাতে উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্টকার্ড) তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে গত বছরে স্মার্টকার্ড যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। বছরের শেষ দিকে (২ অক্টোবর) স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৩ অক্টোবর থেকে আইরিশের প্রতিচ্ছবি এবং দশ আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে ঢাকা এবং কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহলে স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে ইসি। বর্তমানে ঢাকা সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে এটি বিতরণের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশের সব নাগরিকের হাতে এটি তুলে দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ইসির নিজস্ব ভবনের কাজ দ্রুত শেষ করে অফিস স্থানান্তর, নাগরিকদের ভোটার আইডি সংক্রান্ত কার্যক্রম জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিস্তীর্ণ করা, অনলাইনে সব ধরনের সেবার ফরম প্রাপ্তি ও জমার সুবিধাসহ বর্তমান ইসির মেয়াদে হওয়া সাফল্যজনক আরো বিভিন্ন কার্যক্রম এতে তুলে ধরা হয়েছে। বুধবার প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব বিষয়াদিই জনগণের সামনে তুলে ধরবেন তারা। – See more at: http://www.manobkantha.com/2017/02/07/189243.php#sthash.fOaPJjM1.dpuf

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

x

Check Also

মালয়েশিয়ায় ভূমিধসে নিহত ৩, বাংলাদেশিসহ নিখোঁজ ১১

  মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে ভূমিধসে এ পর্যন্ত তিন জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ, ...