সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দশম সংসদের সুনামগঞ্জ-২ আসনের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে আজ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনের শুরুতে এ শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

তিনি আজ (৫ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭১ বছর। শোক প্রস্তাবে স্পিকার বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সমাজসেবক হিসেবে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

এর আগে প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন, কর্ম ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনায় অংশ নেন।

এ ছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, চিফ হুইপ আ. স. ম. ফিরোজ, রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শওকত আলী, আবদুল মতিন খসরু, উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ, অধ্যাপক আলী আশরাফ, ড. আব্দুর রাজ্জাক, হুইপ শাহাবুদ্দিন, শেখ ফজলে নুর তাপস, মুহিবুর রহমান মানিক, আবদুল মজিদ খান, মৃনাল কান্তি দাস, বেগম আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, পীর ফজলুর রহমান, জিয়াউল হক মৃধা, জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল ও স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী আলোচনায় অংশ নেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদের বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। পাশাপাশি বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। তিনি দেশের সংসদ সংসদীয় রাজনীতির জন্য অনেক কিছু দিয়ে গেছেন। সর্বোপরি তিনি গণমানুষের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যু দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। রওশন এরশাদ তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমু বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের একজন সৈনিক হিসেবে তিনি তীক্ষ্ণ বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদ বিরোধী যুদ্ধ এবং সংবিধান ও রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় দেশের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন উচ্চমানের মানুষ ছিলেন। তার রাজনীতির বৈশিষ্ট ছিল অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনীতি করতেন এবং রাজনীতির মধ্য দিয়েই তার জীবনাবসান হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ব্যক্তিগত জীবনে একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। এর পেছনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় তিনি একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হয়ে উঠেন।

তিনি জানান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন অভিনয় শিল্পী এবং নাট্যকর্মীও ছিলেন।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে জাতি একজন দেশ প্রেমিক মানুষকে হারিয়েছে। তিনি মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন। এলাকার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাভাজন একজন নেতা।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, চলমান জঙ্গি দমনের যুদ্ধকে শেষ পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি আমাদের শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে। কারণ তিনি সবসময় অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন।

তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সামরিক শাসনের বিপক্ষে গণতন্ত্রের পক্ষের ঐক্যের ধারক ছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন গণতন্ত্রের সঙ্গে জঙ্গিবাদের আপোষ হতে পারে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংসদে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি আন্দোলন সংগ্রামেও ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার।

ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম দিকপাল এবং এই উপমহাদেশের একজন সেরা ও বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। তিনি আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যু সংসদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তরুণ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সংসদ ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান রাখতেন। তিনি সব সময় দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতেন।

রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। তিনি একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। কথা দিয়ে তিনি মানুষের মন জয় করতে পারতেন।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রায়োগিক রাজনীতি ও সংবিধান সম্পর্কে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিশেষ দখল ছিল।

উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ বলেন, আইন প্রণয়নে তার ছিল অনন্য সাধারণ ক্ষমতা। সংসদীয় পদ্ধতির রাজনীতির তিনি ছিলেন দিকপাল। তার মৃত্যুতে শুধু সিলেটের নয়, সারা বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৬ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের আনোয়ারপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে বিএ (অনার্স) এবং এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সেন্ট্রাল ল’ কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দী এবং উর্দু ভাষায় দক্ষ ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাশেষে তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত হন। তিনি সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সদস্য ছিলেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজনীতির পাশাপাশি নিজ এলাকার ও জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বর্তমানে উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ছিলেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাবেক প্রাদেশিক ও গণপরিষদ সদস্য ছিলেন। তিনি তৃতীয়, পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সপ্তম জাতীয় সংসদে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।

নবম জাতীয় সংসদে তিনি আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় তিনি আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি কার্যপ্রণালী-বিধি সম্পর্কিত কমিটি ও কার্য-উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি সংসদ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পার্লামেন্টারি সংস্থার সম্মেলন, শিক্ষা সফর ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন।

এদিকে শোক প্রস্তাবে বলা হয়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান, প্রখ্যাত আইনজীবী এবং নিবেদিত প্রাণ সমাজসেবককে হারালো।

তার মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ, তার আত্মার শান্তি কামনা এবং শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা হয়।

আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

এর পর সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী বর্তমান সংসদের সদস্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

x

Check Also

ঈদের দিন গণভবনে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ঢাকায় থাকছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঈদের দিন সকাল ...