সাংবাদিক শিমুল হত্যা | অভিযুক্ত মেয়র কথা বলছেন ফোনে, পুলিশ বলছে পলাতক

সিরাজগঞ্জের নিহত সাংবাদিক আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যার মূল অভিযুক্ত শাহজাদপুর পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু টেলিফোনে কথা বলছেন।তিনি ব্যক্তিগত কাজে বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। অথচ পুলিশ বলছে, ‘তিনি পলাতক। তাকে ধরতে বিশেষ অভিযান চলছে’।

স্থানীয়দের অভিযোগ,যে বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে তার মালিক পৌর মেয়র মিরু হলেও তাকে বাদ দিয়েই ধরপাকড় চলছে। সাংবাদিক শিমুলের পরিবারের আশঙ্কা, সময় নষ্ট করে এলাকা থেকে বাইরে চলে যেতে সাহায্য করার পর এখন মিরুকে দেশত্যাগেও সহায়তা করা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে শটগানের গুলিতে আহত হন শাহজাদপুরের সমকাল প্রতিনিধি শিমুল (৪২)।

শাহজাদপুরের দিলরুবা বাস টার্মিনাল থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত রাস্তার কাজ নিয়ে কালীবাড়ি এলাকায় মিরুর ছোট ভাই হাসিবুল ইসলাম পিন্টু পৌর আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ভিপি রহিমের শ্যালক ছাত্রনেতা বিজয়কে বেধড়ক মারধর করে। এতে তার হাত-পা ভেঙে যায়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দলের কর্মী-সমর্থক ও বিজয়ের মহল্লা কান্দাপাড়ার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে দিলরুবা বাস টার্মিনাল এলাকার মহাসড়ক অবরোধ করে। এক পর্যায়ে অবরোধকারীদের একটি অংশ মনিরামপুর এলাকায় অবস্থিত পৌর মেয়রের বাড়ি ঘিরে ইট-পাটকেল মারতে থাকে। এসময় একটি শটগান থেকে গুলি ছোড়া হয়। সংঘর্ষের ছবি তুলতে যাওয়া শিমুলের মাথায় ও মুখে গুলি লাগে। শুক্রবার ঢাকায় নেওয়ার পথে দুপুরে মারা যান তিনি। শটগানের মালিককে এখনও আটক করতে পারেনি পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ,কার বন্দুকের গুলিতে শিমুল নিহত হয়েছেন, সবাই তা জানে। অথচ পুলিশ মূল অভিযুক্তকে আটক না করে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনার পর  পৌর মেয়র মিরু গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও পুলিশ বলছে তিনি পলাতক।  অন্যদিকে শাহজাদপুরের শোকগ্রস্ত মানুষ বলছে, কোনওভাবে মিরুকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলে কিছুতেই মেনে নেওয়া হবে না।

পুলিশ পলাতক বললেও বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন মিরু। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। শিমুলকে গুলি করার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে মিরু বলেন,‘আমার বাড়িতে হামলার ছবি তুলতে গিয়ে সে প্রতিপক্ষের ছোড়া ককটেলের আঘাতে গুরুতর আহত হয়।’ ‘তাহলে আপনি ঢাকায় কেন?’ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,‘ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এসেছি।’

আটকদের বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে পৌর মেয়রকে এখনও পাওয়া যায়নি। আমরা তাকে আটকের চেষ্টা করছি। কোনও ভিডিও থাকলে আমরা সেগুলো তদন্তের জন্য সংগ্রহ করবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন পুলিশ মূল রাস্তার ব্যারিকেড উঠানোর কাজ করছিল। মেয়রের বাসা গলির ভিতরে। সেখানে পুলিশ পরে গিয়েছে।’

সিরাজদিখান থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি পৃথক মামলা হয়েছে। হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কমল কুমার দেবনাথকে তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এডিশনাল এসপি স্যার আমাদের সঙ্গে আছেন।’

শাহজাদপুর পৌর মেয়র মিরুকে আটক করা সম্ভব হয়েছে কিনা প্রশ্নে কমল দেবনাথ বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। আমাদের অভিযান চলছে।’ কিন্তু মিরু গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছে জানানো হলে তিনি বলেন,‘আমরা তাকে পাইনি, তিনি এলাকায় নেই, তার ফোন বন্ধ।’ অন্যরা ফোনে যোগাযোগ করতে পারলে পুলিশ কেন পারছে না প্রশ্নে তিনি কিছু বলবেন না বলে জানান।

শিমুল হত্যার কারণ এলাকাবাসীর অনেকের জানা থাকলেও পুলিশের কাছে কোনও ‘মোটিভ’ নেই বলে জানিয়েছেন কমল দেবনাথ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে এখনও সম্ভাব্য তালিকা করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। কিন্তু হত্যার মোটিভ স্পষ্ট না।’ অনেক প্রত্যক্ষদর্শী থাকার পরও কেন পৌর মেয়রকে আটক করা যায়নি  প্রশ্নের জবাবে তিনি আবারও অভিযান চলছে বলেই জানান।

উল্লেখ্য, শিমুল গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঠিক আগের ‍মুহূর্তের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত হয়। শিমুল হত্যার বিচার দাবি করা আন্দোলনকারী, তার পরিবারের সদস্য সহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেদিন ঘটনাস্থলে অনেকগুলো ভিডিও করা হয়েছিল। সেগুলো যাচাই-বাছাই করলেই দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

x

Check Also

আপীল করলেই গৃহকর সহনীয় করার চেষ্টার উদ্যোগ নিব…

বাবুল হোসেন বাবলা:১৮অক্টোবর নগরীর ইমারত ও জমির পঞ্চবার্ষিকী মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ...