শাসক দলে কেন এত খুনোখুনি

স্বার্থ আর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে পারছেন না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছাড়াও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েছেন। প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। মাঝেমধ্যে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়াও হচ্ছে। কিন্তু থামছে না। খুন হচ্ছেন দলীয় লোকজন। এমনকি গুলি করে সাংবাদিক মেরে ফেলতেও কেউ কেউ দ্বিধা করছেন না।
রাজনৈতিক ও অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, মূলত চারটি কারণে এ ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনা বাড়ছে। এগুলো হল- স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব, প্রত্যাশা অনুযায়ী পদপদবি না পাওয়ার জের, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিষয়সহ মনোনয়ন পাওয়া-না পাওয়ার দ্বন্দ্ব এবং সর্বোপরি এলাকায় কে কার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান- এমন প্রতিযোগিতা থেকেই রক্তারক্তি ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বাস্তবতা হল- এখন মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বলে অন্য কোনো দল নেই। সংঘাত-সহিংসতা যা হচ্ছে সব নিজেদের মধ্যে। তারা মনে করেন, এটির রাশ টেনে ধরতে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ- যারা অপরাধ করছেন তাদের বদ্ধমূল ধারণা, এসব অপরাধ করলেও কিছু হবে না, পার পেয়ে যাবেন। দলীয়ভাবে সাময়িক ব্যবস্থা নেয়া হলেও এলাকার প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে তিনি ফের দলে ফিরে আসতে পারবেন।

সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের কাছে ক্ষমতাসীনদের এমন সব খুনোখুনির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফায়দা নেয়ার রাজনীতির কারণে এসব ঘটে। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যায়, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। আর সে কারণে দলটির আসল নেতাকর্মীর পাশাপাশি অন্যরাও সেদিকেই ছোটেন। এসব ফায়দা বা সুযোগ-সুবিধার ভাগ নিতে গিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় হানাহানি ছাড়াও খুনোখুনিতে লিপ্ত হন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এটা শুধু এ সরকারের আমলে নয়, আগের সরকারগুলোর আমলেও হয়ে এসেছে।
এদিকে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত আট বছরে সারা দেশে নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে দলটির শতাধিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকশ’ নেতাকর্মী-সমর্থকসহ সাধারণ মানুষও। সাধারণ মানুষকেও প্রাণ দিতে হয়েছে। যার সর্বশেষ নজির বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সমকালের সাংবাদিক শিমুল নিহত হওয়ার ঘটনা। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল- শাহজাদপুরের পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর গুলিতেই মারা যান সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুল। নিহত সাংবাদিকের জানাজা-পূর্ব বক্তৃতায় শনিবার সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি হাসিবুর রহমান স্বপন এমন মন্তব্য করেন।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মেটাতে না পারলে সরকারি দলের জন্য আগামী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া অনেক কঠিন হয়ে যাবে। নেতৃত্বের অস্বাভাবিক লড়াই, সবাই নেতা বনে যাওয়া, একক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, সাম্রাজ্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জলমহাল, বালুমহাল দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ কিংবা জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দখল, মনোনয়ন বাণিজ্যসহ নানা কারণে আওয়ামী লীগে গৃহবিবাদ এখন তুঙ্গে। তাই নির্বাচনের আগে ঘরের সংকট বেড়ে গেলে তা নির্বাচনী প্রচারণাসহ সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এমনিতেই সব সময় সরকারি দলকে ব্যাপক সংখ্যায় নেগেটিভ ভোটার ফেস করতে হয়। উপরন্তু, এখন আওয়ামী লীগের জন্য গৃহবিবাদ বাড়তি চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দল অনেক দুঃসময় অতিক্রম করে এই প্রথম টানা দ্বিতীয়বার সরকারে আছে। তাই দল অনেকটাই সুসংহত। নেতাকর্মীসহ সবার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দুশ্চিন্তার বিষয় হল- এর সঙ্গে সঙ্গে দলে হানাহানি-বিভেদ বেড়ে গেছে। ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, টাকা-পয়সা রোজগার, সন্মান-প্রতিপত্তির প্রভাব ও নানা স্বার্থের লড়াইয়ে নেতাকর্মীরা বিরোধে জড়াচ্ছে। সবাই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে মানতে চাইছে না। তবে আশার কথা, এসব সংকট নিরসনে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকায় এখন নেতাকর্মীদের মধ্যে সুবিধাবাদী মানসিকতা কাজ করছে। সবাই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। আর্থিক সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে একে অপরের কাজে ভাগ বসাতে চায়। তা ছাড়া দলের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতাও আছে। দলে শৃংখলার অভাব থাকায় কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এর ফলে এসব কর্মকাণ্ড ঘটছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে দেশে ১৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই ৮৩ জন। আর ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে প্রাণহানি হয়েছে ১৫৩ জনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মধ্যে সংঘাতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। আগের বছর ২০১৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন। আওয়ামী লীগের এসব নেতাকর্মীর বেশির ভাগই আবার নিহত হয়েছেন নিজেদের দ্বন্দ্বে।
অপর এক তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত কয়েক বছরের চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনাগুলোতেও ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ছাপ রয়েছে। যেমন- ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে দিনদুপুরে অপহরণের পর খুন হন সাতজন। বর্বরোচিত এ হত্যাকাণ্ডের শিকার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সবাই আওয়ামী লীগ ঘরানার। এই খুনের পেছনেও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদের বিষয়টি আলোচনার পুরোভাগে উঠে এসেছে। টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি জেলার শীর্ষপদে প্রার্থী হওয়ায় তাকে জীবন দিতে হয়। আর এ খুনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন স্থানীয় এমপি আমানুর রহমান রানাসহ তার তিন ভাই। ২০১৫ সালের এপ্রিলে দিনাজপুর হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সংগঠনের দুই নেতা নিহত হন। অভিযোগ আছে, এর পেছনে স্থানীয় দু’জন এমপির বিরোধ ভূমিকা রেখেছে। আড়াই বছর আগে ফেনীতে প্রকাশ্য-দিবালোকে নৃশংসভাবে খুন হন ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এদিকে গত সপ্তাহে পর পর তিন দিন দেশের চারটি জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে শুক্রবার কুষ্টিয়ার জিয়ারথী ইউনিয়নের মঠপাড়া এলাকায় আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের ঘটনা ছাড়াও একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে ‘টাইগার ক্লাবের’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আমবাগান এলাকায় যুবলীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে চারজন আহত হন। বুধবার রাতে খুন হন নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরোধের জেরে এ খুনের ঘটনা ঘটে বলে তার স্ত্রী টুটুল রানী গণমাধ্যমকে জানান। গত ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহালের দখল কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দু’পক্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ২২ জন আহত হন। ১৬ জানুয়ারি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইউম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করেন আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্যরাই। ১৯ নভেম্বর স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। আগের দিন ১৮ নভেম্বর নিজ বাসায় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তার স্বজনদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই তাকে খুন করা হয়।

Check Also

শনিবার থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে: নসরুল হামিদ

শনিবার থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। …

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply