সংশয়, সমন্বয়হীনতা আর স্ববিরোধের বেড়াজালে ট্রাম্পের ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’

সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার পরিণতি কী হবে তা নিয়ে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশের আওতায় কতটি ভিসা বাতিল হয়েছে তা নিয়ে বিচার বিভাগ ও পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান হাজির করার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, বিভিন্ন মহলের মানুষের সমালোচনা ও বিক্ষোভের পাশাপাশি ট্রাম্পের এ নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে একের পর এক আদালতের স্থগিতাদেশ আসছে। অনেকে আবার স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে অতীতের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ করে সরাসরি মুসলমানদের পরিচয় ব্যবহার করে এই আদেশ জারি করা হলেও ট্রাম্প প্রশাসন বলেই যাচ্ছে যে এটি মুসলিমবিরোধী আদেশ নয়।

সবমিলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংকট, সংশয়, সমন্বয়হীনতা আর স্ববিরোধের ঘেরাটোপে ট্রাম্পের ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’ এক অনিশ্চিত যাত্রা করেছে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ জানুয়ারি (শুক্রবার) এক নির্বাহী আদেশে তিন মাসের জন্য ৭ মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে স্থগিতাদেশ দেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলা হয়, এ সাত দেশের নাগরিকরা তিন মাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো হল-ইরাক, ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া। এই আদেশে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মুসলিমদের বদলে খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘুদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়।

নির্বাহী আদেশের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হয় মুসলমানরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। সংস্কৃতি কর্মীরা এর প্রতিবাদ জানান। নোবেল বিজয়ী শিক্ষা অধিকারকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ট্রাম্পের এ নিষেধাজ্ঞাকে মুসলিমবিরোধী নিষেধাজ্ঞা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

বাতিলকৃত ভিসার সংখ্যা  নিয়ে ধন্দ

শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ভার্জিনিয়ার আলেক্সান্দ্রিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে শুনানি চলার সময় বিচার বিভাগের এক অ্যাটর্নি জানান, ট্রাম্পের আদেশের পর ১ লাখেরও বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে তার কিছুক্ষণ পরই পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকে ভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। পররাষ্ট্র বিভাগ জানায়, সত্যিকার অর্থে বাতিলকৃত ভিসার সংখ্যা ৬০ হাজারের চেয়ে খানিক কম। পররাষ্ট্র বিভাগের দাবি, বিচার বিভাগের উপস্থাপনকৃত সংখ্যা যথার্থ নয়। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ভিসা (যেমন-কূটনীতিক) এবং মেয়াদ শেষ হওয়া ভিসাকেও এ হিসেবের অন্তর্ভূক্ত করায় সংখ্যাটা বেড়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং চলার সময় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। কেননা, ব্রিফিং চলার সময় প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি শন স্পাইসার এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কোনও তথ্য দিতে পারেননি। বিচার বিভাগের অ্যাটর্নির উপস্থাপনকৃত সংখ্যার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে শন স্পাইসার বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি আপনাদের পরে জানাতে পারব। এ মুহূর্তে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নাই।’

আইনি জটিলতায় নির্বাহী আদেশ

ট্রাম্পের এ নির্বাহী আদেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস। আর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট দলীয় অ্যাটর্নিরা এ পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক বলে উল্লেখ করেছেন। শুরুর দিকে গ্রিনকার্ডধারীরাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে বলে জানানো হলেও পরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেক্রেটারি জন কেলি এক বিবৃতিতে জানান, গ্রিনকার্ডধারীরা এর আওতামুক্ত।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ঘোষণার একদিন পর বৈধ ভিসাধারীদের ফেরত পাঠানোর ওপর নিউ ইয়র্কের এক ফেডারেল বিচারপতি স্থগিতাদেশ দেন। ওই আদেশের মেয়াদ ১১ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বৃহস্পতিবার এক বিচারপতি সেই আদেশের মেয়াদ বাড়িয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি করেন।

আলাদাভাবে ডিট্রয়েটের এক ফেডারেল বিচারপতি একটি রুল জারি করেছেন। রুলে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনকার্ডধারীরা ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারবে না। আরব-আমেরিকান সিভিল রাইটস লিগের এক মামলায় এ রুল জারি করা হয়।

ট্রাম্পের আদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়ের করা মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে ব্যস্ত রয়েছেন বস্টন, সিয়াটল ও ভার্জিনিয়ার ফেডারেল বিচারপতিরা। স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর সে আদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবার আবেদন করা হচ্ছে।

শরণার্থী, ভিসাধারী ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিকদের আটক ও বিতাড়িত না করতে সম্প্রতি বস্টনের বিচারপতি যে আদেশ দিয়েছেন তার সময়সীমা বাড়াতে আবেদন জানানোর প্রস্তুতি চলছে। ম্যাসাচুসেটসে দারিদ্র্যবিরোধী সংগঠন অক্সফাম ও সাত ইরানি নাগরিক যৌথভাবে এ আবেদন জানাবে।

সর্বশেষ শুক্রবার (৩ জানুয়ারি)ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে অস্থায়ী স্থগিতাদেশ দিয়েছে সিয়াটলের আদালত। শুক্রবার ট্রাম্পের মুসলিমবিরোধী নিষেধাজ্ঞায় সিয়াটলের সেই আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে ড্রিস্টিক্ট বিচারপতি জেমস রবার্টস ওই নির্দেশ দেন।

মুসলমানদের সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও বারাক ওবামা তেমন কোনও প্রকাশ্য বিদ্বেষ জারি করেননি। সামরিক অভিযান ও গোপন হামলা চালালেও প্রকাশ্যে ধর্মীয় সহনশীলতার অঙ্গীকার করেছেন তারা। ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান প্রশ্নেই একইভাবে ওবামা ও বুশ সরাসরি মুসলমান শব্দ ব্যবহার করে নেতিবাচক ভূমিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেননি। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি মুসলমান পরিচয় ব্যবহার করে, তাদের ‘অপর’ সংক্রান্ত পরিচয়ের রাজনীতিতে বিভক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন।

পরিচয়ের রাজনৈতিক বিভক্তিকেই ট্রাম্প আর বুশ-ওবামার কৌশলগত পার্থক্যের কারণ মনে করেন আরব কূটনীতকদের একাংশ। ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তান, ইরান ও লেবাননসহ ৫টি মুসলিম দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন রায়ান সি. ক্রোকার। পরিচয়ের রাজনীতির পাটাতনে তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ মুসলিম দেশগুলোর পাশ্চাত্যপন্থী এলিটদের হতাশ করবে। ওই দেশগুলো মনে করবে যে যুক্তরাষ্ট্র মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

এদিকে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা যেসব দেশের উপর সরাসরি প্রযোজ্য হবে না, হতাশ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে তারাও। বিশিষ্ট মিসরীয় ঔপন্যাসিক আম্মার আলি হাসান মনে করেন, সত্যিকারের আমেরিকা হারিয়ে যাওয়ার বোধ তৈরি করে এই আদেশ। এটি আর বিশ্ববাসীর  জন্য উন্মুক্ত নয়। নয় বিশ্বমানুষের স্বপ্নের দেশ।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

x

Check Also

জন্মদিনে ‍‍বাহুবলী‍‍কে কী উপহার দিলেন হবু স্ত্রী দেবসেনা

প্রবল পরাক্রমশালী বাহুবলী। একাই শত্রুপক্ষকে রণকৌশলে ঘায়েল করতে পারেন। এমন প্রতাপশালী মানুষটি যার জন্য কাঁধ ...