ডাক্তারদের হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন যখন মৃত্যুর কারণ

৩০ বছর ধরে ফার্মেসি চালাই, এই দীর্ঘ জীবনে কত শত প্রেসক্রিপশন ফিরিয়ে দিয়েছি রোগীদের তার হিসাব নেই। প্রেসক্রিপশনের লেখাগুলো বাংলা নাকি ইংরেজি, নাকি উর্দু ভাষায় লেখা থাকে সেটাই বুঝতে পারি না। আমার মতো অভিজ্ঞ মানুষ যদি এখনও এই সমস্যায় পড়ে তাহলে যারা নতুন ফার্মেসি ব্যবসা শুরু করেছে তাদের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। ডাক্তাদের লেখা প্রেসক্রিপশন সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনকে এমনটাই জানালেন রাজধানীর রমনা এলাকায় অবস্থিত রমনা ফার্মেসির মালিক গোলাম সারোয়ার।

তিনি আরও বলেন, ‘এমনও হয়েছে, রোগী প্রেসক্রিপশন নিয়ে এসেছেন কিন্তু সেখানে কি কি ওষুধের নাম লেখা সেটা বোঝা যাচ্ছে না। তখন চিকিৎসককে ফোন দিয়ে সেই ওষুধের নাম জেনে তাকে ওষুধ দিয়েছি।’

গোলাম সায়োর বলেন, প্রেসক্রিপশন এমনভাবে লেখার কারণে অনেক সময় ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধও দেওয়া হয়। এর দায় যতটা ফার্মেসির লোকদের তারচেয়ে বড় দায় চিকিৎসকের।

এ সময় রমনা ফার্মেসিতে উপস্থিত দুলাল মিয়া নামের ব্যক্তি বলেন, ‘আমি নিজেই তো এই সমস্যায় পড়েছি এখন। হাঁটুর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি প্রেসক্রিপশনে যে ওষুধের নাম লিখিছেন সেটা মগবাজার রেলগেটের একটা ফার্মেসির লোক ধরতে পারেনি। এখন এই ফার্মেসিতে এসে ওষুধ নিলাম। প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম কী ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘ডেফলার্কট’।

মোস্তফা কামাল নামে আরেকজনও জানালেন প্রেসক্রিপশন নিয়ে ভোগান্তির কথা।  তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যখন প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসিতে গেলাম তখন ফার্মেসিতে থাকা ওষুধ বিক্রেতা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। পরে চিকিৎসককে ফোন করে জেনে নিতে হলো ওষুধের নাম। কিন্তু সবার পক্ষে তো আর চিকিৎসককে ফোন দিয়ে ওষুধের নাম জানা সম্ভব নয়।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বাবাকে নিয়ে এসেছেন বরিশালের জান্নাতুল। তিনি একটি প্রেসক্রিপশনটি দেখিয়ে বলেন, ‘যারা একটু কম শিক্ষিত তাদের পক্ষে এমন হাতের লেখা বোঝা একেবারেই দুরূহ। চিকিৎসকদের উচিত ওষুধের নাম স্পষ্ট করে লেখা।’

মগবাজার মোড়ের মেসার্স আমেনা ফার্মেসিতে কর্মরত হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাক্তার গো লেখা উনারা ছাড়া আর কারও পক্ষে বোঝা খুবই কষ্টসাধ্য।’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের হাতের লেখার কারণে ভুল ওষুধ সেবন করছেন অনেক মানুষ। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১০২টি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ গেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে।

২০০৬ সালে আমেরিকার ইনস্টিটিউট অব মেডিসিন (আইওএম) এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের হাতের লেখা বুঝতে না পারার কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৭ হাজার রোগীর মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক এবিএম ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসকের হাতের লেখা দুর্বোধ্য হওয়া উচিত নয়। কারণ প্রেসক্রিপশনে থাকা ওষুধের নাম বোঝা না গেলে ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধ রোগীকে দিতে পারে। ওষুধের জেনেরিক নাম কাছাকাছি হওয়ায়ও যেটি প্রেসিক্রিপশনে লেখা থাকে তার বদলে অন্যটি দিয়ে দেয়। এমন বহু ঘটনা শুনেছি আমরা।’

প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক চিকিৎসকের হাতের লেখা দুর্বোধ্য ও অস্পষ্ট। এর অন্যতম কারণ, খুব দ্রুত রোগী দেখেন এবং যত্ন নিয়ে লিখতে চান না। কিন্তু চিকিৎসকদের হাতের লেখা সহজবোধ্য এবং পাঠযোগ্য হওয়া উচিত। না হলে রোগীর ভোগান্তি বাড়েই। কখনও কখনও মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে উচ্চ আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটি সারাদেশের বেশির ভাগ মানুষের মনের কথা।’

প্রসঙ্গত, ৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট স্পষ্ট অক্ষরে এবং বড় হরফে পড়ার উপযোগী করে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে লেখার নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সার্কুলার জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*